প্রিয় নবীজীর হজ
নবীজী মুহাম্মাদ ﷺ যেভাবে হজ করেছেন
হাদিস ও সিরাত-নির্ভর একটি সচিত্র গ্রন্থ
সুপ্রিয় পাঠক, আমরা বইটিতে পুরাতন সব ছবি ব্যবহার করেছি। ছবিগুলো মাত্র ৭০-১৪০ বছরের পুরানো। এই ছবি গুলো ব্যবহারের পেছনে আমাদের একটি উদ্দেশ্য আছে । আমরা বুঝাতে চেয়েছি যে, নিকট অতীতেও মানুষ পায়ে হেঁটে, উটের উপর সওয়ার হয়ে হজ করেছেন। বায়তুল্লাহর তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ করার সময়ও তারা সূর্যের তাপ থেকে সুরক্ষা পাননি। মাতাফ ছিল কংক্রিট আর বালির। ছবিতে দেখবেন সাঈর রাস্তার উপরে ছিলো টিনের শেড। মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় যাতায়াত করেছেন পায়ে হেঁটে, উটের উপর সওয়ার হয়ে। প্রচন্ড সূর্যের তাপে তাদেরকে থাকতে হয়েছে এসিবিহীন মিনা ও আরাফার তাঁবুতে। মিনা ও আরাফার ময়দানে কোনো গাছ ছিলো না। হাজিদের নিজেদের রান্না করে খেতে হতো। পানি ছিলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ‘নহরে জুবাইদা’ই ছিলো পানিপ্রাপ্তির একমাত্র স্থান। বরফ শীতল পানি পাওয়ার কথা তো চিন্তাই করা যায় না। টয়লেটের সুবিধাও ছিলো অপর্যাপ্ত। এতো বৈরী পরিবেশেও তাঁরা হজ করেছেন। তাঁদের হজ ছিল রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার আনুগত্যে টইটম্বুর।
বর্তমানে হাজিদের জন্য রয়েছে দ্রুতগামী বিমান, বিলাসবহুল জাহাজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ও ট্রেন সার্ভিস। মক্কার হোটেলগুলোতে রয়েছে শতভাগ এসি, উন্নত টয়লেট সুবিধা। মাতাফে রয়েছে বিশেষ ধরণের টাইলস, যা প্রখর সূর্যের তাপেও গরম হয় না। সাফা-মারওয়ার সাঈর রাস্তাও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। শীতল পানির সুবিধা, জায়গায় জায়গায় রয়েছে বরকতময় যমযমের পানি। মিনা- আরাফা- মুযদালিফায় যাতায়াতের জন্য রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ও ট্রেনের ব্যবস্থা। মিনা ও আরাফার তাঁবুগুলোও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। রয়েছে উন্নত টয়লেট ব্যবস্থা,পর্যাপ্ত শীতল পানি।
আরাফার ময়দানে লাগানো হয়েছে অসংখ্য গাছ। মিনা-আরাফায় হাজিদের আর রান্না করতে হয় না। রয়েছে পর্যাপ্ত খাবার আর ফলমূলের ব্যবস্থা, জরুরী চিকিৎসাসেবাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা।
এতো কিছুর ভিড়ে হারিয়ে গেছে নবীজী ﷺ এর প্রতি প্রেম, হারিয়ে গেছে নবীজীﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণকারী আশেকে রাসূলেরা। আমরা আজ কতো আরাম আর সহজে হজ করা যায় তাঁর খোঁজ করি। শারিরীকভাবে সক্ষম থাকার পরও ছেড়ে দিচ্ছি রাসূলের সুন্নাহগুলো। এতো সুযোগ- সুবিধা থাকার পরও আমরা মিনার তাঁবুতে রাত্রিযাপন করিনা। জামরায় পাথর মেরে মক্কার হোটেলে চলে আসি। রাসূলের অনুসরণে নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত সময়ে মিনা, আরাফায় গমণ করি না।
হ্যাঁ, হজের কাফেলাগুলো সৌদি আরবের হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সময়গুলোতে বাসে করে মিনায়, আরাফায় ও মুযদালিফায় নিয়ে যায়। এটা তাঁদের অপারগতা। বৃদ্ধ, শিশু আর মহিলারা এ সুবিধা নিতে পারে।
কিন্তু শক্ত সমর্থ যুবক, আমরা কি পারি না রাসূল ﷺ এর ভালোবাসায় তাঁর সুন্নাহর অনুসরণে মিনা-আরাফা-মুজদালিফায় হেঁটে যেতে! বিশ্বাস করুন, রাসূলﷺ এর সুন্নাহর জন্য এই হেঁটে যাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ, যে তৃপ্তি আপনি পাবেন তা রাতের অন্ধকারে এসিবাসে ৩০-৪০ মিনিটের যাত্রায় পাবেন না।
একবার চিন্তা করুন! আপনি হেঁটে যাচ্ছেন সেই রাস্তায় সেই পথে, যে পথে গিয়েছিলেন রাসূল ﷺ এবং তাঁর সাহাবিরা। উচ্চস্বরে, চিৎকার করে আপনি তালবিয়া পড়ছেন রাসূল ﷺ এর সাহাবিদের মতো। সেই পথ, সেই পাহাড় আপনার তালবিয়ার সাক্ষী থাকছে, যা ছিলো রাসূল ﷺ এর জামানায়। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি আছে! এর চেয়ে মধুর অভিজ্ঞতা আর কি আছে! চোখের পানিতে বুক ভেসে যাবে আপনার। লক্ষ মানুষের এই কাফেলার সাথে আপনি কখন মিনা-আরাফা- মুযদালিফা পৌঁছে যাবেন বুঝতেই পারবেন না।
তাই আসুন আমরা নবীজী ﷺও তাঁর সাহাবিগণ কীভাবে হজ করেছেন তা জানি এবং সেই অনুযায়ী হজ করার চেষ্টা করি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের হজের সফরকে সহজ ও কবুল করুন।
হজ - ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম, যা একজন মুসলিমের জীবনে শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলে একবারই ফরজ হয়। হজ কেবল একটি সফর নয়, এটি আত্মার পরিশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক দুর্লভ সুযোগ। তাই হজ পালনের আগে প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, হজ বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান ও আন্তরিক নিয়তের সমন্বয়।
হজের প্রতিটি ধাপে আমাদের পথপ্রদর্শক হচ্ছেন - রহমতের নবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ। তাঁর দেখানো প্রতিটি পদক্ষেপই আমাদের জন্য হেদায়েত ও পরকালীন মুক্তির পথ। হজের ক্ষেত্রে, তিনি ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে হজ আদায় করেছেন, সেই সুন্নাহ জানা ও অনুসরণ করাই আমাদের প্রধান কাজ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই হজের মূল ফরজ ও ওয়াজিবগুলো নিয়ে সচেতন থাকলেও নবীজীর প্রিয় সুন্নতগুলোর প্রতি উদাসীন থাকেন। ফলে শারীরিকভাবে সক্ষম হয়েও অনেকে হজের বহু মূল্যবান সুন্নাহ পালন থেকে বঞ্চিত হন। যেমন: ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ মিনার তাঁবুতে রাত্রিযাপন, ৯ জিলহজ ফজরের নামাজ মিনায় আদায় করা, ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে যাত্রা করা ইত্যাদি।
এসব আমল শুধুই সুন্নত নয়, বরং নবীজীর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর অনুসরণ ও তাকওয়ার এক উজ্জ্বল প্রকাশ।
এই বইটির মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য হলো নবীজীর হজের সফরটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা - যেন আপনারা জানতে পারেন, প্রিয় রাসূল ﷺ কীভাবে হজ আদায় করেছেন এবং সেই আলোকে নিজের হজকে আরও বেশি সুন্নাতময় করে তুলতে পারেন।
অধ্যায়-১ : মদিনা থেকে মক্কা পর্যন্ত সফরের বর্ণনা
অধ্যায়-২ : মক্কায় প্রবেশ ও উমরা আদায়
অধ্যায়-৩ : পবিত্র হজের দিনগুলি
অধ্যায়-৪ : মক্কা থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তন
আমরা প্রতিটি অধ্যায়কে সহজ ভাষায়, ধারাবাহিকভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরবো ইনশা আল্লাহ, যাতে সুন্নাহ অনুযায়ী হজ আদায়ের প্রতি আপনাদের আগ্রহ ও সচেতনতা বাড়ে। আল্লাহ তায়ালার ঘরের মেহমান হিসেবে আমাদের একমাত্র চাওয়া হওয়া উচিত-নবীজীর দেখানো পথে হজ আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করা।
আল্লাহ আমাদের এই প্রচেষ্টা কবুল করুন, হজের প্রকৃত মর্ম বুঝে হজ আদায় করার তাওফিক দিন। আমিন।