পড়ছেন ভূমিকা

📖 প্রিয় নবীজীর হজ — বইটি ডাউনলোড করুন

হাদিস ও সিরাত-নির্ভর সম্পূর্ণ সচিত্র গ্রন্থটি PDF আকারে সংগ্রহ করুন এবং অফলাইনে পড়ুন।

⬇ ডাউনলোড করুন (PDF) 📖 অনলাইনে পড়ুন 🤝 নবীজী ﷺ এর মতো হজ করতে যুক্ত হোন

📥 মোট ডাউনলোড

۞

প্রিয় নবীজীর হজ

নবীজী মুহাম্মাদ যেভাবে হজ করেছেন

হাদিস ও সিরাত-নির্ভর একটি সচিত্র গ্রন্থ

সুপ্রিয় পাঠক, আমরা বইটিতে পুরাতন সব ছবি ব্যবহার করেছি। ছবিগুলো মাত্র ৭০-১৪০ বছরের পুরানো। এই ছবি গুলো ব্যবহারের পেছনে আমাদের একটি উদ্দেশ্য আছে । আমরা বুঝাতে চেয়েছি যে, নিকট অতীতেও মানুষ পায়ে হেঁটে, উটের উপর সওয়ার হয়ে হজ করেছেন। বায়তুল্লাহর তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ করার সময়ও তারা সূর্যের তাপ থেকে সুরক্ষা পাননি। মাতাফ ছিল কংক্রিট আর বালির। ছবিতে দেখবেন সাঈর রাস্তার উপরে ছিলো টিনের শেড। মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় যাতায়াত করেছেন পায়ে হেঁটে, উটের উপর সওয়ার হয়ে। প্রচন্ড সূর্যের তাপে তাদেরকে থাকতে হয়েছে এসিবিহীন মিনা ও আরাফার তাঁবুতে। মিনা ও আরাফার ময়দানে কোনো গাছ ছিলো না। হাজিদের নিজেদের রান্না করে খেতে হতো। পানি ছিলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ‘নহরে জুবাইদা’ই ছিলো পানিপ্রাপ্তির একমাত্র স্থান। বরফ শীতল পানি পাওয়ার কথা তো চিন্তাই করা যায় না। টয়লেটের সুবিধাও ছিলো অপর্যাপ্ত। এতো বৈরী পরিবেশেও তাঁরা হজ করেছেন। তাঁদের হজ ছিল রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার আনুগত্যে টইটম্বুর।

বর্তমানে হাজিদের জন্য রয়েছে দ্রুতগামী বিমান, বিলাসবহুল জাহাজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ও ট্রেন সার্ভিস। মক্কার হোটেলগুলোতে রয়েছে শতভাগ এসি, উন্নত টয়লেট সুবিধা। মাতাফে রয়েছে বিশেষ ধরণের টাইলস, যা প্রখর সূর্যের তাপেও গরম হয় না। সাফা-মারওয়ার সাঈর রাস্তাও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। শীতল পানির সুবিধা, জায়গায় জায়গায় রয়েছে বরকতময় যমযমের পানি। মিনা- আরাফা- মুযদালিফায় যাতায়াতের জন্য রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ও ট্রেনের ব্যবস্থা। মিনা ও আরাফার তাঁবুগুলোও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। রয়েছে উন্নত টয়লেট ব্যবস্থা,পর্যাপ্ত শীতল পানি।

ভূমিকা

আরাফার ময়দানে লাগানো হয়েছে অসংখ্য গাছ। মিনা-আরাফায় হাজিদের আর রান্না করতে হয় না। রয়েছে পর্যাপ্ত খাবার আর ফলমূলের ব্যবস্থা, জরুরী চিকিৎসাসেবাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা।

এতো কিছুর ভিড়ে হারিয়ে গেছে নবীজী ﷺ এর প্রতি প্রেম, হারিয়ে গেছে নবীজীﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণকারী আশেকে রাসূলেরা। আমরা আজ কতো আরাম আর সহজে হজ করা যায় তাঁর খোঁজ করি। শারিরীকভাবে সক্ষম থাকার পরও ছেড়ে দিচ্ছি রাসূলের সুন্নাহগুলো। এতো সুযোগ- সুবিধা থাকার পরও আমরা মিনার তাঁবুতে রাত্রিযাপন করিনা। জামরায় পাথর মেরে মক্কার হোটেলে চলে আসি। রাসূলের অনুসরণে নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত সময়ে মিনা, আরাফায় গমণ করি না।

হ্যাঁ, হজের কাফেলাগুলো সৌদি আরবের হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সময়গুলোতে বাসে করে মিনায়, আরাফায় ও মুযদালিফায় নিয়ে যায়। এটা তাঁদের অপারগতা। বৃদ্ধ, শিশু আর মহিলারা এ সুবিধা নিতে পারে।

কিন্তু শক্ত সমর্থ যুবক, আমরা কি পারি না রাসূল ﷺ এর ভালোবাসায় তাঁর সুন্নাহর অনুসরণে মিনা-আরাফা-মুজদালিফায় হেঁটে যেতে! বিশ্বাস করুন, রাসূলﷺ এর সুন্নাহর জন্য এই হেঁটে যাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ, যে তৃপ্তি আপনি পাবেন তা রাতের অন্ধকারে এসিবাসে ৩০-৪০ মিনিটের যাত্রায় পাবেন না।

একবার চিন্তা করুন! আপনি হেঁটে যাচ্ছেন সেই রাস্তায় সেই পথে, যে পথে গিয়েছিলেন রাসূল ﷺ এবং তাঁর সাহাবিরা। উচ্চস্বরে, চিৎকার করে আপনি তালবিয়া পড়ছেন রাসূল ﷺ এর সাহাবিদের মতো। সেই পথ, সেই পাহাড় আপনার তালবিয়ার সাক্ষী থাকছে, যা ছিলো রাসূল ﷺ এর জামানায়। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি আছে! এর চেয়ে মধুর অভিজ্ঞতা আর কি আছে! চোখের পানিতে বুক ভেসে যাবে আপনার। লক্ষ মানুষের এই কাফেলার সাথে আপনি কখন মিনা-আরাফা- মুযদালিফা পৌঁছে যাবেন বুঝতেই পারবেন না।

তাই আসুন আমরা নবীজী ﷺও তাঁর সাহাবিগণ কীভাবে হজ করেছেন তা জানি এবং সেই অনুযায়ী হজ করার চেষ্টা করি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের হজের সফরকে সহজ ও কবুল করুন।

হজ - ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম, যা একজন মুসলিমের জীবনে শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলে একবারই ফরজ হয়। হজ কেবল একটি সফর নয়, এটি আত্মার পরিশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক দুর্লভ সুযোগ। তাই হজ পালনের আগে প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, হজ বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান ও আন্তরিক নিয়তের সমন্বয়।

হজের প্রতিটি ধাপে আমাদের পথপ্রদর্শক হচ্ছেন - রহমতের নবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ। তাঁর দেখানো প্রতিটি পদক্ষেপই আমাদের জন্য হেদায়েত ও পরকালীন মুক্তির পথ। হজের ক্ষেত্রে, তিনি ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে হজ আদায় করেছেন, সেই সুন্নাহ জানা ও অনুসরণ করাই আমাদের প্রধান কাজ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই হজের মূল ফরজ ও ওয়াজিবগুলো নিয়ে সচেতন থাকলেও নবীজীর প্রিয় সুন্নতগুলোর প্রতি উদাসীন থাকেন। ফলে শারীরিকভাবে সক্ষম হয়েও অনেকে হজের বহু মূল্যবান সুন্নাহ পালন থেকে বঞ্চিত হন। যেমন: ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ মিনার তাঁবুতে রাত্রিযাপন, ৯ জিলহজ ফজরের নামাজ মিনায় আদায় করা, ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে যাত্রা করা ইত্যাদি।

এসব আমল শুধুই সুন্নত নয়, বরং নবীজীর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর অনুসরণ ও তাকওয়ার এক উজ্জ্বল প্রকাশ।

এই বইটির মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য হলো নবীজীর হজের সফরটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা - যেন আপনারা জানতে পারেন, প্রিয় রাসূল ﷺ কীভাবে হজ আদায় করেছেন এবং সেই আলোকে নিজের হজকে আরও বেশি সুন্নাতময় করে তুলতে পারেন।

অধ্যায়-১ : মদিনা থেকে মক্কা পর্যন্ত সফরের বর্ণনা

অধ্যায়-২ : মক্কায় প্রবেশ ও উমরা আদায়

অধ্যায়-৩ : পবিত্র হজের দিনগুলি

অধ্যায়-৪ : মক্কা থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তন

আমরা প্রতিটি অধ্যায়কে সহজ ভাষায়, ধারাবাহিকভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরবো ইনশা আল্লাহ, যাতে সুন্নাহ অনুযায়ী হজ আদায়ের প্রতি আপনাদের আগ্রহ ও সচেতনতা বাড়ে। আল্লাহ তায়ালার ঘরের মেহমান হিসেবে আমাদের একমাত্র চাওয়া হওয়া উচিত-নবীজীর দেখানো পথে হজ আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করা।

আল্লাহ আমাদের এই প্রচেষ্টা কবুল করুন, হজের প্রকৃত মর্ম বুঝে হজ আদায় করার তাওফিক দিন। আমিন।

প্রিয় নবীজীর হজবইয়ের অধ্যায়সমূহ:
অধ্যায়-১

মদিনা থেকে মক্কা পর্যন্ত সফরের বর্ণনা

۞
📑আলোচ্য বিষয়সমূহমদিনা থেকে মক্কা পর্যন্ত সফরের বর্ণনা
  1. ১. সফর শুরুর পূর্বে খুতবা
  2. ২. মদিনা থেকে যাত্রা
  3. ৩. সফরের বাহন
  4. ৪. যুলহুলাইফায় পৌঁছানো
  5. ৫. ইহরাম
  6. ৬. কুরবানির পশু
  7. ৭. যুলহুলাইফা থেকে প্রস্থান
  8. ৮. রাওহা উপত্যকা
  9. ৯. উসাইয়াহ
  10. ১০. আরজ
  11. ১১. লাহয়ি জামাল
  12. ১২. আযরাক উপত্যকা
  13. ১৩. আবওয়া
  14. ১৪. হারশা গিরিপথ
  15. ১৫. জাবাল জুমদান
  16. ১৬. উসফান
  17. ১৭. হাজীদের শিক্ষা প্রদান
  18. ১৮. সারিফ

বিশুদ্ধ মতানুসারে ৯ম বা ১০ হিজরিতে হজ ফরজ হওয়ার পর বিলম্ব না করে রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিগণ হজ করেন।

হযরত জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় বসবাসকালে দীর্ঘ নয় বছর পর্যন্ত হজ করেননি। দশম বছরে চারিদিকে ঘোষণা দেওয়া হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বছর হজ করবেন। অসংখ্য লোক মদিনায় এসে জমায়েত হলো। বাহনে চড়া অথবা পায়ে হাঁটার সামর্থ্য রাখে এরকম কোনো ব্যক্তি অবশিষ্ট রইল না। সকলেই এসেছে রাসূলের সাথে বের হওয়ার জন্য। সকলেরই উদ্দেশ্য হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসরণ করে তাঁর মতোই হজের আমল সম্পন্ন করা।

২৪শে জিলকদ প্রিয় নবী ﷺ মদিনায় সমবেত সাহাবিদের উদ্দেশে মসজিদে নববীতে একটি জুমার খুতবা প্রদান করেন। এতে তিনি উপস্থিত লোকদের হজের শিক্ষা দেন এবং আসন্ন হজের উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দেন। প্রিয় নবী ﷺ মিম্বারে দাঁড়িয়ে হাজীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদের উদ্দেশে বললেন, হে লোকেরা, আল্লাহ তোমাদের উপর হজ ফরজ করেছেন, তাই হজ আদায় করো। তখন একজন বলল: হে আল্লাহর রাসূল, এটি কি প্রতি বছর পালন করতে হবে? নবী ﷺ নীরব থাকলেন এবং প্রশ্নকারী তিনবার একই প্রশ্ন করল। তখন নবী ﷺ বললেন, যদি আমি ‘হ্যাঁ’ বলতাম, তবে এটি প্রতি বছর ফরজ হয়ে যেত এবং তোমরা তা পালন করতে সক্ষম হতে না। তারপর তিনি বললেন, যেভাবে আমি তোমাদের ছেড়ে দিচ্ছি, সেভাবে আমাকে ছেড়ে দাও। কেননা অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং নবীদের বিরোধিতার কারণে পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ধ্বংস হয়েছে। তাই যখন আমি তোমাদের কিছু করতে বলি, তা যতটুকু পারো করো এবং যখন আমি কিছু করতে নিষেধ করি, তা বর্জন করো।

প্রসারণ: মোট পড়ার সময়: ~২৩ মিনিট
১. সফর শুরুর পূর্বে মসজিদে নববীতে খুতবা~৩ মিনিট
নবী ﷺ-এর সময়ের মসজিদে নববীর মিম্বারের কল্পিত মডেল

নবীজী ﷺ কে ইহরামে প্রবেশের নির্ধারিত স্থান (মীকাত) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়।

হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, “মদিনাবাসীদের ইহরাম বাঁধার স্থান হচ্ছে, যুলহুলাইফা। অন্যপথের লোকদের ইহরাম বাঁধার স্থান হচ্ছে আল-জুহফা, আর ইরাকবাসীদের ইহরাম বাঁধার স্থান হচ্ছে, যাতু ইরক। নাজদবাসীদের ইহরাম বাঁধার স্থান হচ্ছে করন। ইয়ামানবাসীদের স্থান হচ্ছে, ইয়ালামলাম।

আল-জুহফাযাতু ইরককরনইয়ালামলাম১২০ কি.মি৭৮ কি.মি১০০ কি.মি১৮৬ কি.মিযুলহুলাইফা৪২০ কি.মিমীকাত

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন: একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ, ইহরামের অবস্থায় কোন পোশাক পরা যাবে? নবীজী ﷺ উত্তর দিলেন, ইহরামের অবস্থায় জামা, পায়জামা, পাগড়ি, টুপি ও মোজা পরবে না এবং মাথা ঢাকা যায় এমন পোশাকও পরবে না। তবে যদি কারো জুতা না থাকে, সে টাখনুর নিচ পর্যন্ত মোজা কেটে (জুতার ন্যায়) পরবে। ওয়ারস বা জাফরান দ্বারা সুগন্ধযুক্ত কোনো কাপড় পরবে না। ইহরামের অবস্থায় কোনো নারী তাঁর মুখ ঢাকবে না বা দস্তানা পরবে না।

এছাড়াও তিনি হজের বিভিন্ন রীতিনীতি নিয়ে হাজীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকেন।

সেলাইবিহীন চাদরস্যান্ডেল জুতাইহরামের পোশাক

নবী ﷺ এর সময়ের মসজিদে নববীর সম্ভাব্য আকৃতি

যাত্রা শুরুর আগে রাসূল ﷺ মসজিদে নববীতে যেভাবে সাধারণত যোহর সালাত আদায় করতেন, সেভাবে চার রাকআত সালাত আদায় করেন। তিনি তাঁর চুল আঁচড়ে, তেল দিয়ে মাখলেন এবং লুঙ্গি ও চাদর পরলেন।

২৫ শে জিলকদ শনিবার দুপুরে রাসূল ﷺ হাজার হাজার সাহাবি নিয়ে হজের উদ্দেশ্যে মদিনা ত্যাগ করেন। তিনি ‘শাজারা’ নামক রাস্তা দিয়ে মদিনা হতে হজের উদ্দেশ্যে বের হন। জিলকদ মাসের পাঁচ দিন বাকি থাকতে সাহাবিগণ রাসুল ﷺ এর সাথে শুধুমাত্র হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।

হজের এই সফরে পুরুষ, নারী এবং শিশু সবাই ছিলেন। কিছু সাহাবি উট এবং ঘোড়ায় চড়েছিলেন, কিছু হাঁটছিলেন। নারীদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবু বকর রা. এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা., যিনি গর্ভবতী ছিলেন এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় নিকটে ছিল। নবীজী ﷺ এর আত্মীয় যুবা’আ বিনতে যুবায়ের রা. ছিলেন, যিনি হজ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, যদিও তাঁর বয়স এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে তিনি যাত্রা সম্পূর্ণ করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।

হযরত আয়িশা রা. বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ যুবা’আ বিনতে যুবায়েরের কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি হজ করার ইচ্ছা আছে? তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহর কসম, আমি অসুস্থ (কিন্তু হজের ইচ্ছা আছে)। নবীজী ﷺ তাকে বললেন, হজ করার ইচ্ছা করো এবং একটি শর্ত বসাও। বলো, ‘হে আল্লাহ, আমার অবস্থান সেখানে, যেখানে আপনি আমাকে আটকে রাখবেন।’ তিনি মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ রা. এর স্ত্রী ছিলেন।’’১০

রাসূল ﷺ হজের এই সফরে তাঁর সকল স্ত্রীদেরকে সঙ্গে নিয়েছিলেন।

রাসূল ﷺ মদিনা ছাড়ার সময়, আনসারদের বনু সাঈদাহ গোত্রের হযরত আবু দুজানা সিমাক ইবনে খারাশা রা. কে মদিনার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করেন।

২. মদিনা থেকে যাত্রা৩০ সেকেন্ডের কম
১৯০৭ সালের মদিনা

নবীজী ﷺ এর হজের এই বরকতময় সফরের বাহন হিসেবে ছিল ‘কাসওয়া’ নামের একটি উট। ১০ বছর আগে এই উটের পিঠে চড়ে নবী করিম ﷺ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। কাসওয়া ছিল রাসূল ﷺ এর প্রিয় উট। এই উঠের পিঠে অতি সাধারণ একটি জিন লাগানো ছিল। জিনের উপর এক টুকরো কাপড় ছিল, যার মূল্য ছিল চার দিরহামেরও কম।১১

তাঁর বাকী মালপত্র এবং সরঞ্জামগুলো হযরত আবু বকর রা.-এর একটি মালপত্র বহনকারী উটে উঠানো ছিল, যা তারা দুজন ভাগ করে নিয়েছিলেন।

৩. সফরের বাহন~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

সেই দিন বিকেলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাহাবিরা যুলহুলাইফায় পৌঁছান। যুলহুলাইফা একটি উন্মুক্ত মরুভূমি অঞ্চল, যা মদিনা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ‘আকীক উপত্যকা’য় অবস্থিত। এই স্থানটি মদিনা থেকে আগত হাজীদের জন্য মীকাত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই জায়গাটি হাজীদের জমায়েতের স্থান হিসেবে ব্যবহ্রত হত। এখান থেকেই সবাই মক্কার দিকে যাত্রা করতেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ উপত্যকার নীচের অংশে ‘মুআরাস’ নামক স্থানে তাঁবু স্থাপন করেন, যা মসজিদের নীচু জায়গায় অবতরণকারীদের ও রাস্তার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। বর্তমানে এই স্থানটি যুলহুলাইফা মসজিদের মধ্যে অবস্থিত।১২

রাসূল ﷺ এর সাহাবিরাও উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে তাঁবু স্থাপন করেন।

রাসূল ﷺ আসরের সালাত কসর করেন। অর্থাৎ ২ রাকাআত আদায় করেন।১৩

রাতে রাসূল ﷺ এর কাছে মহান রবের পক্ষ থেকে একজন আগমনকারী এসে বললেন, এই কল্যাণময় উপত্যকায় (আকীক উপত্যকা) সালাত আদায় করুন এবং উমরাকে হজের অন্তর্ভুক্ত করুন ।১৪

সেই রাতেই হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা. একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন, যার নাম রাখা হয় মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাল্লাহ ﷺ এর কাছে লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন যে, আমি কী করব? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তুমি গোসল কর, রক্তক্ষরণের স্থানে একটি কাপড় বেঁধে নাও এবং ইহরাম বাঁধ। তাওয়াফ ব্যতীত হজের সকল বিধান পালনের অনুমতি দিলেন।১৫

*** একটু চিন্তা করুন তো, একজন গর্ভবতী মহিলা, যিনি জানেন যে তাঁর প্রসবের সময় সন্নিকটে এরপরও হজের জন্য বের হয়েছেন। হজের নিয়ত বা ইহরাম তখনও করেন নি। সন্তান প্রসব হয়ে গেছে। মদিনা থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে আছেন। চাইলেই নিজের বাসায় ফেরত যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি ফেরত যান নি। দুধের শিশু নিয়ে আরবের বৈরী পরিবেশে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে হজের সকল বিধান পালন করেছেন। আমাদের হজ কি তাঁদের চেয়েও কঠিন!!!!

৪. যুলহুলাইফায় পৌঁছানো~১ মিনিট

সকাল বেলা নবী করিম ﷺ তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীকে আলাদাভাবে সময় দেন১৬ এবং, নিশ্চিত করেন যে তারা সফরের জন্য স্বস্তিদায়ক ও প্রস্তুত আছেন। এরপর তিনি পোশাক পরিবর্তন করে গোছল করেন।১৭ চুলে আঠালো বস্তু ব্যবহার করেন,১৮ যাতে পুরো সফরে তা ধুলাবালি ও উকুন থেকে সুরক্ষিত থাকে।

উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রা. নিজ হাতে রাসূল ﷺ কে মিশকযুক্ত একটি সুগন্ধি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইহরামে প্রবেশের আগে এবং তাওয়াফে যিয়ারাহর পূর্বে আমি নিজ হাতে তাঁকে সুগন্ধি মাখিয়েছিলাম।১৯ এই সুগন্ধি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথার সামনে এবং দাঁড়িতে দৃশ্যমান ছিল।২০

এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ ইহরামের সেলাইবিহীন সাদা পোশাক পরিধান করেন, দুই রাকাত যোহরের সালাত আদায় করেন এবং সালাতের স্থানেই তালবিয়া পাঠ শুরু করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যুলহুলাইফার মসজিদের নিকট হতে ইহরাম বেঁধেছেন।২১

রাসূল ﷺ ইহরামের শুরুতে

لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا

বলেছেন।২২ অন্য বর্ণনায়,

اللَّهُمَّ حِجَّةٌ لاَ رِيَاءَ فِيهَا وَلاَ سُمْعَةَ

(হে আল্লাহ আমি এমন হজের নিয়ত করছি যাতে লোক দেখানো বা খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্য নেই।)২৩

রাসূল ﷺ এর তালবিয়া,২৪

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ ، لاَشَرِيكَ لَكَ
৫. ইহরাম~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ যুলহুলাইফায় যোহরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর কুরবানির উট নিয়ে আসতে বললেন এবং উটের কুঁজের ডান দিক দিয়ে ফেড়ে দিলেন। ফলে রক্ত প্রবাহিত হলো (একে ইশআর বলে)। তিনি রক্তের চিহ্ন মুছে দেন। এরপর উটটির গলায় দুটি পাদুকার মালা পরিয়ে দিলেন। এরপর নিজের বাহনে আরোহণ করলেন। অতঃপর যখন আল বায়দায় পৌঁছালেন, তখন তিনি হজের তালবিয়া পাঠ করলেন।২৫

রাসূল ﷺ হজে কুরবানির জন্য ৬৩টি উট সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। এই উটগুলোকে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মালা পরানো হতো, যা ‘তাকলিদ’ নামে পরিচিত।

এটি ছিল আল্লাহর নির্ধারিত একটি বিধানের প্রতি সম্মানের প্রকাশ, যাকে আল্লাহ নিজে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَٱلْبُدْنَ جَعَلْنَـٰهَا لَكُم مِّن شَعَـٰٓئِرِ ٱللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌۭ

‘আর উটগুলো ও গবাদিপশু, যেগুলো আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহ হিসেবে নির্ধারণ করেছি; তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে।’ [সুরা আল-হজ্জ, ২২:৩৬]

সাহাবি হযরত নাজিয়া আল খুজাই রা. ( অন্য বর্ণনায় যুওয়াইব আবূ কাবীসা রা.) নবী ﷺ এর আদেশে কুরবানির পশুগুলো মক্কায় নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। হযরত নাজিয়া রা. বর্ণনা করেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ, যদি কোনো কুরবানির পশু আহত হয়, তাহলে আমি কী করব? তিনি বললেন, এটি জবাই কর, তার স্যান্ডেল রক্তে ভিজিয়ে দাও এবং মানুষের জন্য রেখে দাও, যাতে তারা খেতে পারে। তবে তুমি এবং তোমার সঙ্গীরা সেই গোশত খাবে না।২৬

৬. কুরবানির পশু~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

হাদী (কুরবানির পশু) চিহ্নিত করার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উটনীতে আরোহণ করেন এবং সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন অবস্থায় যুলহুলাইফা থেকে যাত্রা শুরু করেন। যখন ‘কাসওয়া’ চলতে শুরু করে, তখন রাসূল ﷺ কিবলার দিকে মুখ করে আবার তালবিয়া পাঠ করেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, আমি দেখেছি, আল্লাহর রাসূল ﷺ যুলহুলাইফা নামক স্থানে তাঁর বাহনের উপর আরোহণ করেন, বাহনটি সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তিনি তালবিয়া উচ্চারণ করতে থাকেন।২৭

নবী করিম ﷺ যখন বাইদা নামক জায়গায় পৌঁছালেন, তখন তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ), তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ), তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) এবং তাকবির (আল্লাহু আকবর) পাঠ করছিলেন। এরপর তিনি উচ্চস্বরে হজ ও উমরার তালবিয়া পাঠ করেন।২৮

নবী করিম ﷺ এর তালবিয়া পাঠের সঠিক স্থান নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে কিছু মতভেদ ছিল। যেমন, সাহাবিরা রাসূল ﷺ কে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তালবিয়া পাঠ করতে শুনেছিলেন: তাঁর সালাতের স্থানে, উটে চড়ার সময় এবং বাইদা পাহাড়ে উঠার সময়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ হজের সময় কিরান হজের নিয়ত করেছিলেন,২৯ যাতে হজ ও উমরা এক সাথে করা হয়। উমরার পরও ইহরাম অবস্থায় থাকতে হয়।

রাসূল ﷺ এর চারপাশে বিশাল সংখ্যক মানুষ যাত্রা করেছিল। সফরে রাসূল ﷺ অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন এবং কোনো ধরনের বিশেষ আচরণ/ সম্মানের জন্য কখনোই রাজি ছিলেন না।

হযরত জাবির রা. বলেন, আমি আমার দৃষ্টিপথে যতদূর যায় তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর সামনে কেবল আরোহী ও পায়ে হেঁটে যাত্রারত মানুষ আর মানুষ। তাঁর ডানে অনুরূপ, তাঁর বামেও অনুরূপ তাঁর পেছনেও অনুরূপ মানুষ আর মানুষ। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর ওপর পবিত্র কুরআন নাযিল হয়। তিনিই তাঁর ব্যাখ্যা জানেন। আর যে আমল তিনি করছিলেন আমরা তা হুবহু আমল করছিলাম।৩০

৭. যুলহুলাইফা থেকে প্রস্থান~৪৫ সেকেন্ড

হযরত খাল্লাদ ইবনু সাইব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন, জিবরাইল আমার কাছে এসে বলেন যে, আমার সাহাবিদেরকে যেন আমি উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠের নির্দেশ প্রদান করি।৩১

সাহাবিগণ নবী করিম ﷺ এর নির্দেশ অনুযায়ী উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করতে শুরু করলেন। তারা তালবিয়ার সাথে আরও কিছু শব্দ যোগ করেছিলেন, لَبَّيْكَ ذَا الْمَعَارِجِ, لَبَّيْكَ ذَا الْفَوَاضِل এছাড়াও لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ بِيَدَيْكَ لَبَّيْكَ وَالرَّغْبَاءُ إِلَيْكَ وَالْعَمَلُ ।৩২ কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদেরকে এটা রদ করতে বলেন নি।

তবে তিনি বার বার তালবিয়া পাঠ করছিলেন। হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, তালবিয়ায় রাসূলুল্লাহ

ﷺ لَبَّيْكَ إِلهَ اْلَحقِّ لَبَّيْكَ

ও বলেছেন।৩৩

হযরত জাবির রা. বলেন, আমরা বলছিলাম,

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ

(লাব্বাইক আল্লাহুম্মা)

لَبَّيْكَ بالحج

(লাব্বাইকা বিলহাজ্জ)। আমরা খুব চিৎকার করে তা বলছিলাম। আর আমরা কেবল হজেরই নিয়ত করছিলাম। আমরা হজের সাথে উমরার কথা তখনও জানতাম না।৩৪

হযরত সাহল ইবনু সাদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, যখন কোনো মুসলিম তালবিয়া পাঠ করে তখন তাঁর ডানে ও বামে পাথর, বৃক্ষরাজি, মাটি সবকিছুই তাঁর সাথে তালবিয়া পাঠ করে। এমনকি পৃথিবীর এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত পর্যন্ত (তালবিয়া পাঠকারীদের দ্বারা) পূর্ণ হয়ে যায়।৩৫

নবী ﷺ রাওহায় যেখানে সালাত আদায় করেছিলেন

৮. রাওহা উপত্যকা~২ মিনিট

রাসূল ﷺ যখন রাওহা উপত্যকা পার হচ্ছিলেন, তিনি বলেন, সত্তরজন নবী রাওহা পথে হজ করতে এসিছিলেন, তারা উলের পোশাক পরেছিলেন।৩৬

এই হাদীস থেকে জানা গেল যে, রাওহা উপত্যকা দিয়ে পূর্বেও অনেক নবী হজ করতে মক্কায় গিয়েছেন। ঈসা আলাইহিস সালামও এই পথে হজ/উমরা করতে মক্কায় যাবেন।

রাসূল ﷺ বলেছেন, সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! মরিয়ম পুত্র ঈসা নিশ্চয়ই রাওহা উপত্যকায় হজ অথবা উমরা অথবা উভয়ের তালবিয়া পাঠ করবেন।৩৭

হযরত উমায়র ইবনে সালামা যামরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল ﷺ এর সঙ্গে মদিনার রাওহা নামক স্থান অতিক্রম করছিলাম এবং সকলেই ছিলাম হজের ইহরাম অবস্থায়। এমন সময় একটি আহত বন্য গাধা আমাদের দৃষ্টিগোচর হল। রাসূল ﷺ বললেন, একে ছেড়ে দাও, হয়তো এর শিকারি মালিক আসছে। এমন সময় বাহায গোত্রের এক ব্যক্তি, যে গাধাটিকে আঘাত করেছিল, সে এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই গাধা আপনি নিয়ে নিন। রাসূল ﷺ আবু বকর রা. কে সকলের মাঝে এর মাংস বণ্টন করে দিতে আদেশ দিলেন।৩৮

হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর রা. বলেছেন: নবী ﷺ শারাফুর-রাওহা’র মসজিদের কাছে ছোট মসজিদের স্থানে সালাত আদায় করেছিলেন। নবী ﷺ যেখানে সালাত আদায় করেছিলেন, আবদুল্লাহ রা. সে স্থানের পরিচয় দিতেন এই বলে যে, যখন তুমি মসজিদে সালাতে দাঁড়াবে তখন তা তোমার ডানদিকে। আর সেই মসজিদটি হল যখন তুমি (মদিনা থেকে) মক্কা যাবে তখন তা ডানদিকের রাস্তার এক পাশে থাকবে। সে স্থান ও বড় মসজিদের মাঝখানে ব্যবধান হল একটি ঢিল নিক্ষেপ পরিমাণ অথবা তার কাছাকাছি। আর ইবনু উমর রা. রাওহার শেষ মাথায় ’ইরক’ (ছোট পাহাড়) এর কাছে সালাত আদায় করতেন। সেই ’ইরক’ এর শেষ প্রান্ত হল রাস্তার পাশে মসজিদের কাছাকাছি মক্কা যাওয়ার পথে রাওহা ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে।৩৯

রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবিদের নিয়ে ‘উসাইয়াহ’ নামক জায়গায় পৌঁছলে, ছায়ায় শুয়ে থাকা একটি হরিণ দেখতে পান, যা তীর দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত ছিল। রাসূল ﷺ একজন সাহাবিকে নির্দেশ দেন হরিণটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য, যেন সকলেই সেটিকে অতিক্রম করে সামনে চলে যাওয়া পর্যন্ত কেউ হরিণটিকে বিরক্ত করতে না পারে।৪০

রাসূল ﷺ এ জায়গায় সালাত আদায় করেছিলেন

৯. উসাইয়াহ৩০ সেকেন্ডের কম
১০. আরজ~৪ মিনিট

যখন কাফেলা ‘আরজ’ নামক জায়গায় পৌঁছালো, রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিগন বিশ্রামের জন্য থামলেন। নবীজী ﷺ তাঁর প্রিয় স্ত্রী আয়িশা রা. এর পাশে বসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে হযরত আয়িশা রা. এর বাবা হযরত আবু বকর রা. ও তাঁর আরেক কন্যা হযরত আসমা রা. বসেছিলেন। হযরত আবু বকর রা. তাঁর সেবকের অপেক্ষায় ছিলেন, যিনি তাঁর ও রাসূল ﷺ এর মালপত্র বহনকারী উটটি নিয়ে আসার কথা। কিছুক্ষণ পর সেবক এলেন কিন্তু তাঁর চেহারায় ছিল হতাশার ছাপ। আবু বকর রা. জিজ্ঞেস করলেন, উট কোথায়? সেবক উত্তরে বলল, আমি উট হারিয়ে ফেলেছি। এ কথা শুনে আবু বকর রা. রেগে গেলেন এবং সেবককে ধমক দিয়ে বললেন, তোমার দায়িত্ব ছিল শুধু একটি উট দেখাশোনা করা, আর সেটাই তুমি হারিয়ে ফেললে!। নবীজী ﷺ হাসলেন এবং আশেপাশের লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, দেখো তো, ইহরামের অবস্থায় এই মানুষটি কী করছে!৪১

পরে জানা গেল, সেবক যখন উসাইয়াতে পৌঁছান, তখন কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য উটকে বসিয়ে রাখেন। এরপর ঘুমিয়ে পড়েন। সেই ফাঁকে উটটি উঠে পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে শুরু করে। যখন সেবকের ঘুম ভাঙল, তখন তিনি উটের পিছু নেন এবং ডাকতে থাকেন, কিন্তু উটটি থামেনি।

এদিকে রাসূল ﷺ এর উট হারিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে আনসারদের নাদলা আল-আসলামি পরিবার নবীজী ﷺ এর জন্য এক থালা হায়স (শুকনো দই, খেজুর ও চর্বি দিয়ে তৈরি খাবার) নিয়ে এলেন। এই খাবার সাধারণত দীর্ঘ সফরের জন্য প্রস্তুত করা হতো। তাঁরা নবীজী ﷺ এর হাতে খাবারটি তুলে দিলেন।

নবীজী ﷺ হযরত আবু বকর রা. কে ডাকলেন, এসো, আবু বকর! আল্লাহ আমাদের জন্য পবিত্র খাবার পাঠিয়েছেন।

কিন্তু হযরত আবু বকর রা. তখনো তাঁর সেবকের ওপর বিরক্ত ছিলেন। রাসূল ﷺ তাঁকে শান্ত করে বললেন, শান্ত হও, আবু বকর! এই ব্যাপার আমাদের হাতে নেই। ছেলেটি ইচ্ছে করে উট হারায়নি। আর দেখো, আল্লাহ আমাদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই খাবার দিয়েছেন।

অবশেষে হযরত আবু বকর রা. শান্ত হলেন এবং নবীজী ﷺ ও তাঁর পরিবারসহ খাবার উপভোগ করলেন।৪২

কিছুক্ষণ পর কাফেলার পেছনের দিকের দায়িত্বে থাকা সাহাবি হযরত সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল রা. উটটি খুঁজে পেলেন এবং রাসূল ﷺ এর কাছে নিয়ে এলেন। নবীজি ﷺ হযরত আবু বকর রা.-কে বললেন, মালপত্র পরীক্ষা করো, কিছু হারিয়েছে কি না। আবু বকর রা. দেখে বললেন, আমাদের কিছুই হারায়নি। শুধু সেই পানপাত্রটি নেই, যেটা দিয়ে আমরা পানি পান করতাম। সেবক জানালেন, পানপাত্রটি তাঁর কাছেই আছে। আবু বকর রা. সাফওয়ানকে বললেন, আল্লাহ তোমার হাতে অর্পিত জিনিস সঠিকভাবে পৌঁছে দিক।৪৩

এদিকে হযরত সা’দ ইবনে উবাদা রা. (যিনি খাযরাজ গোত্রের সা’ইদা বংশের নেতা ছিলেন) এবং তাঁর ছেলে হযরত কায়স ইবনে সা’দ রা. একটি উট নিয়ে রাসূল ﷺ এর খোঁজে এলেন। তাঁরা নবীজী ﷺ কে খুঁজে বের করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কাছে খবর এসেছে যে আপনার উট হারিয়ে গেছে। তাই আমরা এটি বদলি হিসেবে নিয়ে এসেছি।

নবীজী ﷺ বললেন, আল্লাহ আমাদের উট ফেরত দিয়েছেন। তাই আমরা এটি ফেরত দিচ্ছি। আল্লাহ তোমাদের প্রতি বরকত দান করুন। ওহে আবু সাবিত, মদিনায় আসার পর থেকে যে আন্তরিক আতিথেয়তা তোমরা আমাদের দেখিয়ে আসছ, সেটাই কি যথেষ্ট নয়?

হযরত সা’দ রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কৃপায় আমাদের জন্য আপনার নেয়া জিনিসগুলোই সবচেয়ে মূল্যবান।

নবীজী ﷺ বললেন, আবু সাবিত! সুসংবাদ গ্রহণ করো, কারণ তুমি সফল হয়েছ। নিশ্চয়ই দয়া ও উদারতা আল্লাহর হাতে থাকে। আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা তা দান করেন। আল্লাহ তোমাকে উত্তম চরিত্র দান করেছেন। সা’দ রা. বললেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এই মর্যাদা দিয়েছেন।

তখন হযরত সাবিত ইবনে কায়স রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! জাহিলি যুগেও সা’দ রা.-এর পরিবার আমাদের নেতা ছিলেন এবং দুর্ভিক্ষের সময় আমাদের খাবার দিতেন।

নবীজী ﷺ বললেন, মানুষ আগের মতোই থাকে। জাহিলি যুগের মধ্যে যারা উত্তম ছিল, ইসলাম গ্রহণের পরও তারা উত্তম থাকে, যদি তারা সঠিক বুঝ অর্জন করে।৪৪

হযরত ফুদাইল ইবনে সুলায়মান রা. বর্ণনা করেন: ‘নবীজী ﷺ আরজের একটি পাহাড়ের পাশে, হাদবার পথে, একটি নির্দিষ্ট স্থানে নামাজ পড়তেন। সেই স্থানে একটি মসজিদ ছিল, যেখানে দুই বা তিনটি কবর ছিল। সেই কবরগুলোর পাশে কিছু পাথরের চিহ্ন এবং সালাম গাছ ছিল, যা রাস্তার ডান পাশে ছিল।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. যখন আরজ দিয়ে যেতেন, তখন দুপুরের পর সূর্য হেলে পড়লে তিনি সেই মসজিদে যোহরের নামাজ আদায় করতেন।৪৫

যাত্রা চলাকালীন নবী করিম ﷺ এর প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হয়। রাসূল ﷺ এর মাথাব্যথা তীব্র হয়ে ওঠলে ‘লাহয়ি জামাল’ নামক স্থানে মাথার মাঝখানে শিঙ্গা (কাপিং) চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।৪৬ পূর্বে তাঁর পায়ের যন্ত্রণা নিরাময়ের জন্যও কাপিং করা হয়েছিল।৪৭

১১. লাহয়ি জামাল~৪৫ সেকেন্ড

রাসূল ﷺ আযরাক উপত্যকার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় নবী মুসা আ. কে দেখতে পেলেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে আমরা মক্কা ও মদিনার মধ্যকার এক স্থানে সফর করছিলাম। আমরা একটি উপত্যকা অতিক্রম করছিলাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, এটি কোন উপত্যকা? সঙ্গীগণ উত্তর করলেন, আযরাক উপত্যকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমি যেন এখনো মূসা আ. কে দেখতে পাচ্ছি, তিনি তাঁর কর্ণদ্বয়ের ছিদ্রে অঙ্গুলি রেখে উচ্চস্বরে তালবিয়াহ্ পাঠ করে এ উপত্যকা অতিক্রম করে যাচ্ছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ মূসা আ. এর দেহের বর্ণ ও চুলের আকৃতি সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু রাবী দাউদ তা স্মরণ রাখতে পারেননি।৪৮

১২. আযরাক উপত্যকা৩০ সেকেন্ডের কম
নবী ﷺ আবওয়ায় যেখানে সালাত আদায় করেছিলেন
১৩. আবওয়া~১ মিনিট

নবীজী ﷺ ও তাঁর সাহাবিগণ ‘আবওয়া’ নামক স্থানে অবতরণ করেন। এই স্থানটি ছিল নবীজী ﷺ এর মমতাময়ী মা আমিনার চিরনিদ্রার স্থান। নবীজী ﷺ যখন ছোট ছিলেন, তখন তাঁর মা তাঁকে মদিনায় নিয়ে গিয়েছিলেন আত্মীয়-স্বজন ও মদিনা শহরের সাথে পরিচয় করানোর জন্য। মদিনা থেকে ফেরার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দুঃখজনকভাবে আবওয়া গ্রামে মারা যান, সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

হযরত সাআব ইবনে জাসসামাহ রা. যিনি এই অঞ্চলের বাসিন্দা এবং তিনি নবীজী ﷺ এর জন্য শিকার করা একটি গাধা থেকে কিছু মাংস নিয়ে আসেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, সাআব ইবনে জাসসামাহ রা. রাসূল ﷺ এর জন্য বন্য গাধার মাংস হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন। আর তিনি তখন ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। রাবী বলেন, তাই রাসূল ﷺ এ হাদিয়া তাঁকে ফেরত দিলেন এবং বললেন, আমরা যদি ইহরাম অবস্থায় না থাকতাম তবে তোমার এ হাদিয়া অবশ্যই গ্রহণ করতাম।৪৯

এরপর রাসূল ﷺ হারশা গিরিপথে এলেন। তিনি বললেন, এটি কোন গিরিপথ? সঙ্গীগণ বললেন, হারশা গিরিপথ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমি যেন ইউনুস আ. কে দেখতে পাচ্ছি তালবিয়া পাঠ করা অবস্থায় তিনি গিরিপথ অতিক্রম করে যাচ্ছেন। তাঁর গায়ে একটি পশমী জুব্বা, আর তিনি একটি লাল উটের পিঠে আরোহিত। তাঁর উটের রশিটি খেজুর বৃক্ষের ছাল দ্বারা তৈরি।৫০

১৪. হারশা গিরিপথ৩০ সেকেন্ডের কম
১৫. জাবাল জুমদান~১ মিনিট

যখন কাফেলা ‘জুমদান’ পাহাড়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল- যা মক্কা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে খুলাইস গ্রামের নিকট অবস্থিত- তখন নবীজী ﷺ কে জানানো হলো যে কিছু সাহাবি মক্কায় দ্রুত পৌঁছানোর আগ্রহে কাফেলা ছেড়ে এগিয়ে গেছে।

নবীজী ﷺ বললেন, চলতে থাকো। এটি জুমদান পাহাড়। মুফাররিদুনরা এগিয়ে গেছে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, মুফাররিদুন কারা?

তিনি উত্তর দিলেন, তারা সেইসব ব্যক্তি, যারা নিজেদের সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন রাখে ( অর্থাৎ অধিক পরিমাণে জিকির করে)। তাদের জিকির তাদের ভারী বোঝা হালকা করে দেবে, এতটাই যে কিয়ামতের দিনে তারা খুব হালকা বোঝা বহন করবে।৫১

রাসূল ﷺ যখন উসফান উপত্যকার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পূর্ববর্তী নবীদের একটি দৃশ্য দেখলেন। তিনি বললেন: ‘নবী হুদ আ. এবং নবী সালিহ আ. এই উপত্যকা অতিক্রম করেছিলেন। তারা লাল বর্ণের তরুণ উটনির পিঠে সওয়ার ছিলেন, যার লাগাম ছিল সুতার তৈরি। তাদের পরিধানের পোশাক ছিল সাধারণ এবং গায়ের জামা ছিল উলের তৈরি। তারা প্রাচীন গৃহ তথা কাবা তাওয়াফের জন্য রওয়ানা হয়েছিলেন।’৫২

১৬. উসফান~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

যাত্রাপথে নবীﷺ তাঁর সাহাবিদের শিক্ষা ও পথনির্দেশনা দিতে থাকেন। আসন্ন হজ্জের জন্য তাঁদের প্রস্তুত করেন। তিনি শুধু যে তালবিয়াহ পাঠ করতে শুনলেন। রাসূলুল্লাহﷺ এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন: ‘শুবরুমার পক্ষ থেকে লাব্বাইক’। নবীﷺ প্রচুর প্রশ্নের উত্তর দিতেন তাই নয়, বরং তিনি সাহাবিদের প্রশ্নও করতেন। একবার তিনি এক ব্যক্তিকে অন্য কারো পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘শুবরুমা কে?’ সে বলল, আমার ভাই, অথবা সে বলল আমার নিকটাত্মীয়। তিনি বললেন, তুমি কি নিজের হজ করেছ? সে বলল, না। তিনি বললেন, (আগে) নিজের হজ করো, তারপর শুবরুমার পক্ষ থেকে হজ করবে।৫৩

অন্য এক সময়ে, নবী ﷺ এক ব্যক্তিকে খালি পায়ে হাঁটতে এবং একটি উট নিয়ে চলতে দেখলেন, যার কুঁজের চারপাশে একটি দড়ি বাঁধা ছিল এবং তার গলায় জুতা ঝুলছিল, যা নির্দেশ করছিল যে এটি একটি কুরবানির পশু। লোকটি খুব ক্লান্ত ছিল। নবীﷺ তাকে বললেন, ‘এর উপর চড়ো।’ সে উত্তর দিল: ‘এটি একটি কুরবানির পশু।’ নবী ﷺ আবার বললেন: ‘এর উপর চড়ো!’ তারপর আমি সেই ব্যক্তিকে নবীর আনুগত্য প্রদর্শন করে এর উপর চড়তে দেখলাম।৫৪

ইসলামের আবির্ভাবের আগে কুরবানির পশুর উপর চড়া আরবদের দ্বারা নিষিদ্ধ ছিল, কারণ এগুলোকে পবিত্র মনে করা হতো। নবীﷺ এই প্রথা বাতিল করেন।৫৫

হযরত আবু তালিক রা. নবীﷺ কে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনার সঙ্গে হজ করার সমান কি? নবীﷺ উত্তর দিলেন, রমজান মাসে উমরাহ করা।৫৬

১৭. হাজীদের শিক্ষা প্রদান~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

কঠিন যাত্রা প্রায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে নবী ﷺ মক্কার প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে ‘সারিফ’ নামক জায়গায় তাবু স্থাপন করেন। সারিফ সেই স্থান যেখানে নবীﷺ হজের তিন বছর আগে মায়মুনা বিনতে হারিস রা. কে বিবাহ করেছিলেন এবং এখানেই তাঁর কবরস্থান।

হযরত আয়িশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজের মাসে আমরা রাসূল ﷺ-এর সাথে হজে বের হয়ে সারিফ নামক স্থানে অবতরণ করলাম। রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবিগণের নিকট বেরিয়ে ঘোষণা করলেন: যার সাথে কুরবানির পশু নেই এবং যে এ ইহরাম ‘উমরাহ’র ইহরামে পরিণত করতে আগ্রহী, সে তা করতে পারবে। আর যার সাথে কুরবানির পশু আছে সে তা পারবে না। হযরত ‘আয়িশা রা. বলেন, কয়েকজন সাহাবি ‘উমরাহ করলেন, আর কয়েকজন তা করলেন না। তিনি বলেন, নবী ﷺ ও তাঁর কয়েকজন সাহাবি (দীর্ঘ ইহরাম রাখতে) সক্ষম ছিলেন এবং তাঁদের সাথে কুরবানির পশু ছিল। তাই তাঁরা শুধু উমরা করে হালাল হতে পারলেন না।৫৭

রাসূল ﷺ তাঁর স্ত্রী হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কাঁদতে দেখলেন। হযরত আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে হজের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলাম। সারিফ নামক স্থানে এসে আমি ঋতুবতী হই। এ সময় নবী ﷺ এসে আমাকে কাঁদতে দেখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, এ বছর হজ না করাই আমার জন্য পছন্দনীয়। তিনি বললেন, সম্ভবত তুমি ঋতুবতী হয়েছ। আমি বললাম, জি। তিনি বললেন, এতো আদম কন্যাদের জন্য আল্লাহ নির্ধারিত করেছেন। তুমি পাক হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য হাজীদের মত সমস্ত কাজ করে যাও, কেবল কাবার তাওয়াফ করবে না।৫৮

১৮. সারিফ৩০ সেকেন্ডের কম

মায়মুনা বিনতে হারিস রা. কবরের পুরাতন একটি ছবি

📚তথ্যসূত্রএই অধ্যায়ের সূত্রসমূহ (৫৮টি)
  • ১. মুসলিম, হাদীস নং ২৮২১(ইফা)
  • ২. মুসলিম, হাদীস নং ২৮২১(ইফা)
  • ৩. বুখারী, হাদীস নং ৭২৮৮; মুসলিম, হাদীস নং ১৩৩৭
  • ৪. বুখারী, হাদীস নং ১৩৩ ও ১৫২৫; মুসলিম, হাদীস নং ১১৮২
  • ৫. বুখারী, হাদীস নং ১৮৩৮ ও ৫৮০৫; মুসলিম, হাদীস নং ১১৭৭
  • ৬. বুখারী, হাদীস নং ১০৮৯ ও ১৫৪৬; মুসলিম, হাদীস নং ৬৯০
  • ৭. বুখারী, হাদীস নং ১৫৪৫।
  • ৮. বুখারী, হাদীস নং ১৫৩৩; মুসলিম, হাদীস নং ১২৫৭
  • ৯. বুখারী, হাদীস নং ১৭০৯, ১৭২০ ও ২৯৫২; নাসাঈ, হাদীস নং ২৬৫০
  • ১০. বুখারী, হাদীস নং ৫০৮৯; মুসলিম, হাদীস নং ১২০৭ ও ১২০৮
  • ১১. ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৮৯০
  • ১২. বুখারী, হাদীস নং ১৫৩৫ ও ২৩৩৬; মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪৬
  • ১৩. বুখারী, হাদীস নং ১০৮৯ ও ১৫৪৭; মুসলিম, হাদীস নং ৬৯০
  • ১৪. বুখারী, হাদীস নং ১৫৩৪
  • ১৫. মুসলিম, হাদীস নং ১২০৯, ১২১০ ও ১২১৮
  • ১৬. বুখারী, হাদীস নং ২৭০; মুসলিম, হাদীস নং ১১৯২
  • ১৭. তিরমিযি, হাদীস নং ৮৩০
  • ১৮. বুখারী, হাদীস নং ১৫৪০
  • ১৯. বুখারী, হাদীস নং ১৭৫৪; মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৯ ও ১১৯০
  • ২০. বুখারী, হাদীস নং ১৫৩৮ ও ৫৯২৩; মুসলিম, হাদীস নং ১১৯০
  • ২১. বুখারী, হাদীস নং ১৫৪১; নাসাঈ, হাদীস নং ২৭৫৪ ও ২৭৫৭
  • ২২. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭৯৫
  • ২৩. ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৮৯০।
  • ২৪. বুখারী, হাদীস নং ১৫৪৯; মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৪
  • ২৫. মুসলিম, হাদীস নং ১২৪৩; বুখারী, হাদীস নং ১৫৪৫
  • ২৬. মুসলিম, হাদীস নং ১৩২৬; আত-তিরমিযি, হাদীস নং ৯১০
  • ২৭. বুখারী, হাদীস নং ১৫১৪, ১৫৫৩ ও ২৮৬৫; মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৭
  • ২৮. বুখারী, হাদীস নং ১৫৫১ ও ১৭১৪; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭৭৪ ও ১৭৯৬
  • ২৯. বুখারী, হাদীস নং ১৫৫১; মুসলিম, হাদীস নং ১২৫১
  • ৩০. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৩১. আত-তিরমিযি, হাদীস নং ৮২৯; নাসাঈ, হাদীস নং ২৭৫৩
  • ৩২. মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৪; আহমদ, হাদীস নং ১৪৭৫ ও ১৪৪৪০; ইবন আবি শাইবা, হাদীস নং ১৩৪৭২
  • ৩৩. ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৯২০
  • ৩৪. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৩৫. আত-তিরমিযি, হাদীস নং ৮২৮; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৯২১
  • ৩৬. আল-আজরাকি, আখবার মাক্কাহ, খণ্ড ১, পৃ. ৪৯; আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, খণ্ড ২, পৃ. ৫৯৮; আবু ইয়ালা, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ৪২৭৫ ও ৭২৩১
  • ৩৭. মুসলিম, হাদীস নং ১২৫২
  • ৩৮. নাসাঈ, হাদীস নং ২৮১৮ ও ৪৩৪৪; মালিক, হাদীস নং ৭৮৪
  • ৩৯. বুখারী, হাদীস নং ৪৮৪-৪৯২
  • ৪০. নাসাঈ, হাদীস নং ২৮১৮; মালিক, হাদীস নং ৭৮৪
  • ৪১. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮১৮; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৯৩৩
  • ৪২. আল-ওয়াকিদি, কিতাব আল-মাগাজি, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৯৪-১০৯৫
  • ৪৩. একই, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৯৩
  • ৪৪. একই, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৯৫; ইবন আসাকির, তারিখ দিমাশক, খণ্ড ২০, পৃ. ২৫৮
  • ৪৫. বুখারী, হাদীস নং ৪৮৮
  • ৪৬. বুখারী, হাদীস নং ১৮৩৬, ৫৬৯৮, ৫৬৯৯ ও ৫৭০০
  • ৪৭. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮৩৭; নাসাঈ, হাদীস নং ২৮৪৮ ও ২৮৪৯
  • ৪৮. ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৮৯১।
  • ৪৯. বুখারী, হাদীস নং ১৮২৫ ও ২৫৯৬; মুসলিম, হাদীস নং ১১৯৩ ও ১১৯৪
  • ৫০. ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৮৯১
  • ৫১. মুসলিম, হাদীস নং ২৬৭৬; আত-তিরমিযি, হাদীস নং ৩৫৯৬
  • ৫২. আহমদ, হাদীস নং ২০৬৭; আল-বায়হাকি, শু'আব আল-ঈমান, হাদীস নং ৩৭১৪
  • ৫৩. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮১১; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৯০৩
  • ৫৪. বুখারী, হাদীস নং ১৬৮৯, ১৭০৬ ও ২৭৫৪; মুসলিম, হাদীস নং ১৩২২ ও ১৩২৩
  • ৫৫. ইমাম নববী, শারহ সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৯, পৃ. ৭৩-৭৪; ইবন হজর, ফাতহুল বারি, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৩৬-৫৩৮
  • ৫৬. আল-তাবারানী, আল-মু’জামুল কাবীর, খণ্ড ২২, পৃ. ৩২৪
  • ৫৭. বুখারী, হাদীস নং ১৫৬০, ১৭৮৬ ও ১৭৮৮; মুসলিম, হাদীস নং ১২১১
  • ৫৮. বুখারী, হাদীস নং ৩০৫, ১৫৬০, ১৭৮৬ ও ১৭৮৮; মুসলিম, হাদীস নং ১২১১
অধ্যায়-২

মক্কায় প্রবেশ এবং উমরা আদায়

۞
📑আলোচ্য বিষয়সমূহনবীজীর ﷺ হজ : মক্কায় প্রবেশ এবং উমরা আদায়
  1. রাসূল ﷺ এবং তাঁর সাহাবিগণ জিলহজের ৪ তারিখ রবিবার মক্কায় প্রবেশ করেন এবং উমরা আদায় করেন। এরপর মক্কার পূর্বে অবস্থিত ‘আবতাহ’ নামক জায়গায় গমন করেন এবং সেখানে হজের শুরু পর্যন্ত অবস্থান করেন।
  2. এই পর্বে আমরা মদীনা থেকে সফর করে মক্কায় পৌঁছানোর পর মক্কায় প্রবেশ এবং উমরা আদায়ের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরব।
  3. ১. যী-তুয়ায় অবস্থান
  4. ২. মক্কায় প্রবেশ
  5. ৩. মসজিদুল হারামে প্রবেশ
  6. ৪. হাজরে আসওয়াদ
  7. ৫. বায়তুল্লাহর তাওয়াফ
  8. ৫.১ রমল
  9. ৫.২ হাজরে আসওয়াদ
  10. ৫.৩ রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মাঝের দুআ
  11. ৬. মাকামে ইব্রাহিম
  12. ৭. সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ
  13. ৭.১ সাফা পাহাড়ে
  14. ৭.২ মারওয়া পাহাড়ের দিকে
  15. ৭.৩ মারওয়া পাহাড়ে
  16. ৭.৪ একটি ঘোষণা
  17. ৮. উমরা শেষে আবতাহে অবস্থান
  18. ৮.১ আলী ইবনে আবি তালিব রা. আগমন
  19. ৮.২ আবু মুসা আশআরী রা. আগমন
  20. ৮.৩ জিলহজের ৭ তারিখ

রাসূলﷺ মক্কায় প্রবেশের পূর্বে ‘যী-তুয়া’ নামক জায়গায় তাঁবু ফেলেন, যা বর্তমানে ‘জারওয়াল’ বা ‘আবার আল জাহির’ নামে পরিচিত। এখানে তিনি রাত্রিযাপন করেন। ৪ই জিলহজ নবী করিমﷺ সেখানে নির্মিত মসজিদের পাশে একটি বড় টিলার কাছে ফজরের সালাত আদায় করেন। এরপর মক্কায় প্রবেশের আগে তাঁর স্বাভাবিক অভ্যাস অনুযায়ী তুয়ার কূপের পানি দিয়ে গোসল করেন।

তুয়া কূপতুয়া কূপকূপ সংলগ্ন মসজিদ
প্রসারণ: মোট পড়ার সময়: ~২০ মিনিট
১. যী-তুয়ায় অবস্থান~৩০ সেকেন্ড

রাসূলﷺ এর মক্কায় ও কাবায় প্রবেশের সম্ভাব্য পথ

যীতুয়া

রাসূল ﷺ কাবা ও তাঁর মধ্যে অবস্থিত পাহাড়, জাবাল আযাখিরের দিকে অগ্রসর হন এবং সকালের মাঝামাঝি সময়ে সানিয়্যা উলয়া (হারামের উত্তর-পূর্বদিকে ‘কাদা’ নামক উঁচু স্থান) দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। তিনি ‘কাসওয়া’ নামক উটে চড়ে উপত্যকা দিয়ে নামার সময় তালবিয়া পাঠ করছিলেন।

রাসূল ﷺ মক্কায় পোঁছালে আব্দুল মুত্তালিব বংশের কয়েকজন তরুণ তাঁকে স্বাগত জানায় এবং আনন্দ প্রকাশ করে। তিনি তাদের একজনকে তাঁর সামনে এবং অন্যজনকে তাঁর পিছনে বসিয়ে মাসজিদুল হারামের দিকে যাত্রা করেন।

মক্কা নগরী
২. মক্কায় প্রবেশ~৪৫ সেকেন্ড

মসজিদের গেটে পৌঁছানোর পর রাসূল ﷺ তাঁর উট থেকে নামেন এবং নতুন করে ওযু করেন। হযরত আয়িশা রা. বলেন, ‘নবী ﷺ মক্কায় পৌঁছে প্রথম যে কাজটি করেছিলেন তা হল ওযু করা এবং তারপর তিনি কাবার তাওয়াফ করেন।’

সেই সময় মসজিদুল হারামে ছোট একটি খোলা চত্বর ছিল এবং কাবা ঘরটি ছিলো তাঁর কেন্দ্রে। তিনি ‘বাব আবদে মানাফ’ নামে পরিচিত গেট দিয়ে প্রবেশ করেন, যা বর্তমানে ‘বাব বনি শায়বাহ’ বা ‘বাব আস-সালাম’ নামে পরিচিত, যা সাফা এবং মারওয়ার মধ্যে নবী ﷺ এর জন্মস্থানের একই পাশে অবস্থিত। নবী ﷺ মক্কায় অবস্থানের সময় সাধারণত মসজিদে প্রবেশের জন্য এই গেটটি ব্যবহার করতেন।

মসজিদে প্রবেশের পর দুই রাকাত নফল সালাত (তাহিয়াতুল মসজিদ) আদায় করা নবী ﷺ এর অভ্যাস ছিল। তবে সেইদিন তিনি মসজিদুল হারামে প্রবেশের পর সালাত আদায় না করে সরাসরি কাবার দিকে যান।

আস সালাম গেটবাব বনি শায়বাহ
৩. মসজিদুল হারামে প্রবেশ~৩০ সেকেন্ড
কাবা, ১৯৫৪ সাল

রাসূলুল্লাহ্ ﷺ হাজরে আসওয়াদের কাছে এলেন এবং তাঁর হাত পবিত্র পাথরে উপর রাখলেন এবং আল্লাহর মহিমা ঘোষনা করলেন। অতঃপর পাথরে চুমু দিয়ে দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন। যখন তিনি মাথা তোলেন, তখন হযরত উমর রা. কেও কাঁদতে দেখেন এবং বললেন, ‘উমর, এটাই কাঁদার জায়গা।’

পরবর্তীতে হযরত উমর রা. হাজরে আসওয়াদে চুমু দেওয়ার সময় বলতেন, আল্লাহর কসম! আমি জানি তুমি একটি পাথর এবং উপকার বা ক্ষতি কিছুই করতে পারো না। যদি আমি নবী ﷺ-কে তোমাকে স্পর্শ ও চুম্বন করতে না দেখতাম, তবে আমি কখনই তোমাকে স্পর্শ ও চুম্বন করতাম না।

হাজরে আসওয়াদের একটি পুরোনো ছবি

৪. হাজরে আসওয়াদ~৪৫ সেকেন্ড

রাসূল ﷺ একটি ইয়ামানী সবুজ চাদর তাঁর ডান বগলের নীচে দিয়ে তার দু’পাশ বাম কাঁধে রাখা অবস্থায় (ইযতিবা) বায়তুল্লাহর তাওয়াফ সম্পন্ন করেন।

এরপর নবীﷺ তাঁর ডান দিকে চললেন এবং বাইতুল্লাহকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে তাওয়াফ করেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন: বায়তুল্লাহ তাওয়াফের সময় নবী ﷺ এমন একজন ব্যক্তির পাশ দিয়ে যান, যিনি তার হাত অন্য ব্যক্তির সাথে দড়ি বা সুতা বা এই জাতীয় কিছু দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন। নবী ﷺ নিজের হাতে তা কেটে দিয়ে বলেন: 'তাকে হাত ধরে নিয়ে যাও।

ইসলামের আগমনের আগে হজযাত্রার সময় আরবরা এই প্রথা অনুসরণ করত। নবী ﷺ জাহেলিয়াতের সময় হজযাত্রায় উদ্ভাবিত এবং প্রবর্তিত প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠান থেকে হজকে পরিশুদ্ধ করতে থাকেন এবং প্রতিটি রীতিকে তার মূল রূপে ফিরিয়ে আনেন।

৫. বায়তুল্লাহর তাওয়াফ~৩ মিনিট

রাসূলﷺ প্রথম তিন চক্করে রমল করলেন। এমনকি তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে ফিরে এলেন। এভাবে তিন চক্কর শেষ করলেন। আর শেষ চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে হাঁটলেন।

রমল হচ্ছে, ঘন পদক্ষেপে বীরের মতো দ্রুত হাঁটা। যা একজন যোদ্ধাকে অনুকরণ করে। রমল ৭ম হিজরিতে শুরু হয়েছিল, যখন নবী ﷺ এবং তার সাহাবিগণ উমরাহ করার জন্য মক্কায় এসেছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন: যখন আল্লাহর রাসূলﷺ এবং তার সাহাবিগণ মক্কায় আসেন, তখন পৌত্তলিকরা এই খবর ছড়িয়ে দেয় যে, তাদের কাছে একদল লোক আসছে এবং তারা ইয়াসরিবের (মদিনা) জ্বরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই নবীﷺ তার সাহাবিদের তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করতে এবং দুটি কোণের (হাজরে আসওয়াদ এবং রুকন আল-ইয়ামানী) মধ্যে হাঁটতে নির্দেশ দেন। নবী ﷺ তাদের প্রতি দয়ার কারণে তাওয়াফের সব চক্করে রমল করতে নির্দেশ দেননি।১০

রমল সম্পর্কে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন: রমল করার আমাদের কোনো কারণ নেই, আমরা কেবল পৌত্তলিকদের সামনে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে চেয়েছিলাম এবং এখন আল্লাহ তাদের ধ্বংস করেছেন। তবুও, নবী ﷺ এটা করেছেন এবং আমরা এই সুন্নত ত্যাগ করতে চাই না।১১

৫.১রমল করা৩০ সেকেন্ডের কম

হাজরে আসওয়াদের একটি পুরোনো ছবি

হাজরে আসওয়াদ
৫.২হাজরে আসওয়াদ~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

প্রতিটি তাওয়াফের সময় রাসূল ﷺ হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুম্বন করতেন এবং রুকনে ইয়ামানীও স্পর্শ করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন: “রাসূলুল্লাহﷺ প্রত্যেক তাওয়াফে রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ এবং হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া পরিত্যাগ করেননি।”১২

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. আরও বর্ণনা করেন: “যখন নবী ﷺ রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করতেন, তখন ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পাঠ করতেন১৩ এবং যখন তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে আসতেন, তখন ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন।”১৪

রাসূলﷺ হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ বা ইস্তিলাম করার পর তাঁর হাতে চুম্বন করতেন। হযরত নাফি রা. বর্ণনা করেন: “আমি ইবনে উমর রা. কে তাঁর হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে এবং তারপর তাঁর হাতে চুম্বন করতে দেখেছি। তিনি বলেন, আমি যখন থেকে আল্লাহর রাসূলﷺ কে এটি করতে দেখেছি, তখন থেকে এটি পরিত্যাগ করিনি।”১৫

হাজরে আসওয়াদের চারপাশে ভিড় থাকলে রাসূলﷺ উমর রা. কে বলেন, ‘উমর, তুমি একজন শক্তিশালী মানুষ। পাথরের কাছে ধাক্কাধাক্কি করো না, হয়তো দুর্বল কাউকে আঘাত করতে পারো। যদি ভিড় না থাকে তাহলে স্পর্শ করো। অন্যথায় এর দিকে মুখ করে দাঁড়াও এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বলো।১৬

নবী ﷺ তাওয়াফের সময় লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইঙ্গিত করে তাকবীর (‘আল্লাহু আকবার’) উচ্চারণ করেছিলেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন: আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর উটের উপর চড়ে কাবার চারপাশে তাওয়াফ করেছিলেন এবং যখনই তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে পৌঁছাতেন, তখনই কোন কিছুর দ্বারা তার দিকে ইঙ্গিত করতেন এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন।১৭

তিনি কাবার বাকি দুটি কোণ স্পর্শ করেননি।১৮

রাসূলﷺ রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে নিচের দুআটি পাঠ করতেন,

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ার কল্যাণ দিন, আখিরাতের কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।১৯

রুকনে ইয়ামানীহাজরে আসওয়াদ
৫.৩রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মাঝের দুআ৩০ সেকেন্ডের কম
رَبَّنَآ ءَاتِنَا فِي ٱلدُّنۡيَا حَسَنَةَ وَ فِى ٱلۡأٓخِرَةِ حَسَنَةَ وَقِنَا عَذَابَ ٱلنَّارِ

মাকামে ইব্রাহিমের পুরোনো ছবি

মাকামে ইব্রাহিম (ইব্রাহিম আ. এর পায়ের ছাপ)

৬. মাকামে ইব্রাহিম~১ মিনিট

তাওয়াফ শেষ করার পর রাসূলﷺ মাকামে ইব্রাহিমের দিকে হেঁটে যান, যা কাবার পূর্ব দেয়াল সংলগ্ন ছিল। মাকামে ইব্রাহিমে পৌঁছে তিনি উচ্চস্বরে নিম্নলিখিত আয়াতটি পাঠ করেন,২০ যাতে লোকেরা শুনতে পায়:

وَٱتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبۡرَٰهِ

ۧمَ مُصَلَّىۖ

অর্থ: আর তোমরা মাকামে ইব্রাহিমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর। (সূরা আল-বাকারা, ২:১২৫)

এরপর মাকামে ইব্রাহিমকে তাঁর ও বায়তুল্লাহ’র মাঝখানে রেখে দু’রাকাত সালাত আদায় করলেন। প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পাঠ করেন।২১

সালাত শেষে তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে ফিরে আসেন এবং চুম্বন করেন ।২২

রাসূল ﷺ মুলতাজামে আসেন, যেখানে তিনি তাঁর বরকতময় বুক, হাত ও গাল লাগিয়ে রেখে দু’আ করেন।২৩

এরপর তিনি যমযমের কাছে গিয়ে যমযমের পানি পান করলেন এবং তাঁর নিজের মাথায় ঢাললেন।২৪

বায়তুল্লাহমাকামে ইব্রাহিমসালাতের স্থান

তারপর ‘সাফা দরজা’ দিয়ে বের হয়ে ‘সাফা পাহাড়ে’ গেলেন। সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি এসে পাঠ করলেন:

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ

অর্থ:“নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়ে শুরু করছি”।২৫

অতঃপর তিনি সাফা পাহাড় দিয়ে শুরু করলেন এবং কাবাঘর দেখা যায় এই রকম উঁচুতে ওঠলেন।২৬

সাফা পাহাড় থেকে সাঈর রাস্তা , ১৯৫০ সাল

সাফা গেট, ১৯৪০ সাল
৭. সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ~৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

সাফা পাহাড়ে তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর তাওহীদ, বড়ত্ব ও প্রশংসার কথা ঘোষণা করলেন এবং বললেন,

اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لَآ إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَهٗ لَهُ الْمُلْكُ وَ لَهُ اْلَحمْدُ يُحْيِى وَيُمِيْتُ وَهَوُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ، لَآ إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَهٗ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ

“আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। প্রশংসাও তাঁর। তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন; তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রু-দলগুলোকে পরাজিত করেছেন।” অতঃপর এর মাঝে তিনি অন্য দো‘আ করলেন এবং এরূপভাবে এই দুআটি তিনবার পাঠ করলেন।২৭

সাফা পাহাড়, ১৯২০ সাল
৭.১সাফা পাহাড়ে~৪৫ সেকেন্ড

এরপর মারওয়া পাহাড়ের দিকে হেঁটে চললেন। যখন তিনি বাতনুল ওয়াদীতে পদার্পন করলেন, তখন তিনি দৌঁড়াতে লাগলেন। অবশেষে যখন তাঁর পদযুগল উপত্যকার অপর প্রান্তে মারওয়ায় আরোহন করতে গেল, তখন তিনি স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগলেন।২৮

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কায় এলেন। তার আশেপাশে প্রচুর লোক সমাগম হলো। এমনকি যুবতী মেয়েরা পর্যন্ত (তাকে একটু দেখার জন্য) ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। লোকেরা বলাবলি করছিল, ইনি মুহাম্মাদ ইনি মুহাম্মাদ। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সামনে থেকে লোকদেরকে হটিয়ে দেয়া হতো না। তার আশেপাশে প্রচুর লোক সমাগম হবার কারণে তিনি (উটে) আরোহণ করেন, অথচ স্বাভাবিক গতিতে পদব্রজে যাওয়া ও সাঈ করা উত্তম।২৯

সাফা-মারওয়া সাঈর স্থান ১৯৪০ সাল

৭.২মারওয়া পাহাড়ের দিকে৩০ সেকেন্ডের কম

অবশেষে মারওয়ায় এলেন। অতঃপর তাতে চড়লেন এবং বায়তুল্লাহ’র দিকে তাকালেন। সাফা পাহাড়ে যা করেছিলেন মারওয়া পাহাড়েও তাই করলেন। তিনি সাফা ও মারওয়ার মধ্যে মোট সাতটি চক্কর দেন।৩০

মারওয়া পাহাড়, ১৯০০ সাল
৭.৩মারওয়া পাহাড়ে~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

সাঈ শেষে মারওয়া পাহাড়ে এসে তিনি বললেন, হে লোক সকল! “আমি আগে যা করে এসেছি তা যদি আবার নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকত, তাহলে হাদীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং অবশ্যই আমি হজকে উমরায় পরিণত করতাম। তোমাদের মধ্যে যার সাথে হাদী বা পশু নেই সে যেন হালাল হয়ে যায় এবং এটাকে উমরাতে পরিণত করে।”৩১

সাহাবিগণের মধ্যে যারা হাদী সঙ্গে নিয়ে আসেননি, রাসূল ﷺ তাদেরকে উমরা করে হালাল হতে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তাদের হজ মুশরিকদের বিপরীত হয়। কেননা মুশরিকরা মনে করতো হজের মাসসমূহে উমরা পালন জঘন্যতম অপরাধ।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, “বায়তুল্লাহ’র তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করে তোমরা তোমাদের ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাও এবং চুল ছোট করে ফেল। অতঃপর হালাল অবস্থায় অবস্থান কর। এমনভাবে যখন তারবিয়া দিবস (জিলহজের আট তারিখ) হবে, তোমরা হজের ইহরাম বেঁধে তালবিয়া পাঠ কর। আর তোমরা যে হজের ইহরাম করে এসেছ, সেটাকে তামাত্তুতে পরিণত কর। সাহাবিগণ বললেন, এ ইহরামকে আমরা কিরূপে ‘উমরাহ’র ইহরাম বানাব? আমরা হজের নাম নিয়ে ইহরাম বেঁধেছি। তখন রাসূল ﷺ বললেন: আমি তোমাদেরকে যা আদেশ করছি তাই কর। কুরবানির পশু সঙ্গে নিয়ে না আসলে তোমাদেরকে যা করতে বলছি, আমিও সেরূপ করতাম। কিন্তু কুরবানি করার পূর্বে (ইহরামের কারণে) নিষিদ্ধ কাজ (আমার জন্য) হালাল নয়।”৩২

তখন সুরাকা ইবন মালিক ইবন জু‘শুম মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে ছিলেন, তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের এ উমরায় রূপান্তর করা, অপর শব্দে এসেছে তিনি বলেছেন, এভাবে তামাত্তু করা কি শুধু আমাদের এ বছরের জন্য নাকি সব সময়ের জন্য? তখন নবী ﷺ দু’হাতের আঙ্গুলগুলো পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করালেন এবং দুইবার বললেন, উমরা হজের ভেতর প্রবেশ করেছে। এবং আরও বললেন, না, সর্বকালের জন্য, সর্বকালের জন্য।৩৩

৭.৪একটি ঘোষণা~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

হযরত সুরাকা ইবন মালিক রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদেরকে দীনের ব্যাখ্যা দিন, আমাদেরকে যেন এখনই সৃষ্টি করা হয়েছে (অর্থাৎ আমাদেরকে সদ্যভূমিষ্ট সন্তানের ন্যায় দীনের তালীম দিন)। আজকের আমল কিসের উপর ভিত্তি করে? কলম যা লিখে শুকিয়ে গিয়েছে এবং তাকদীর যে বিষয়ে অবধারিত হয়ে গিয়েছে, তার ভিত্তিতে? না কি ভবিষ্যতের নতুন কোনো বিষয়ের ভিত রচিত হবে?

রাসূলﷺ বললেন, “না, বরং যা লিখে কলম শুকিয়ে গিয়েছে এবং যে ব্যাপারে তাকদীর নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে, তা-ই তোমরা আমল করবে।” তিনি বললেন, তাহলে আর আমলের দরকার কি? তখন রাসূলুল্লাহﷺ বললেন, “তোমরা আমল করে যাও, তোমাদের কেউ যে জন্য সৃষ্ট হয়েছ, তার জন্য সে কাজটা করা সহজ করে দেওয়া হয়েছে।” ৩৪

হযরত জাবির রা. বলেন, তিনি আমাদেরকে আদেশ দিলেন, আমরা হালাল হয়ে গেলে যেন হাদীর ব্যবস্থা করি।৩৫ আমাদের মধ্য থেকে এক উটে সাতজন অংশ নিতে পারে।৩৬ যার সাথে হাদী নেই সে যেন হজের সময়ে তিন দিন সাওম পালন করে, আর যখন নিজ পরিবারের নিকট অর্থাৎ দেশে ফিরে যাবে তখন যেন সাতদিন সাওম পালন করে।৩৭ অতঃপর আমরা বললাম, কী হালাল হবে? তিনি বললেন, “সব কিছু হালাল হয়ে যাবে।’’৩৮ বিষয়টি আমাদের কাছে কঠিন মনে হল এবং আমাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে গেল।৩৯

*তামাত্তু হাজী উমরার পরে মাথার চুল ছোট করবে, কামাবে না। এটিই হচ্ছে উত্তম। যাতে করে, পরে দশ তারিখ মাথা কামাতে পারে। যারা মাথা কামাবে তাদের জন্য রাসূল যে দুআ করেছেন তা হজের পরের হালাল হওয়া বা শুধু উমরার জন্য আসার পর তা সম্পাদন করার পর হালাল হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত।

৮. উমরা শেষে আবতাহে অবস্থান~৮ মিনিট

আবতাহ/বাতহা/ মুহাসসাব/খাইফ বনি কিনানা

উমরা সম্পন্ন করার পর, নবীﷺ এবং তাঁর সাহাবিরা মক্কার পূর্বে অবস্থিত ‘আবতাহে’ যান, যা ‘ওয়াদি আল-মুহাসসাব’ বা ‘খাইফ বনি কিনানাহ’ নামেও পরিচিত। আবতাহ ছিল তাঁবু স্থাপনের একটি আদর্শ স্থান, কারণ এটি খোলা এবং আরামদায়ক ছিল এবং এ এলাকার কূপগুলো পর্যাপ্ত জল সরবরাহ করত। তিনি রবিবার যোহর থেকে বৃহস্পতিবার ফজর পর্যন্ত মোট চার দিন আবতাহে অবস্থান করেন। তিনি সেখানে ২০ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন, এবং সবগুলো সালাত কসর (সংক্ষিপ্ত) করেন।

রাসূল ﷺ এর যে সাহাবিরা তাদের কুরবানির পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, যেমন হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, তালহা, যুল ইয়াসারা, যুবায়ের ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম তারা ইহরামের অবস্থায় ছিলেন। রাসূলﷺ এর স্ত্রীগণ, যারা কুরবানির পশু আনেননি, তারা ইহরাম থেকে মুক্ত হন, যদিও তারা হজ ও উমরাহ একত্রিত করার (কিরান হজ) ইচ্ছা করেছিলেন। একমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিলেন হযরত আয়িশা রা. যিনি ঋতুস্রাবের কারণে ইহরামের অবস্থায় ছিলেন।

রাসূলﷺ এর সহধর্মিণী হযরত হাফসা রা. বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! লোকদের কী হল, তারা ‘উমরা শেষ করে হালাল হয়ে গেল, অথচ আপনি উমরা হতে হালাল হচ্ছেন না? তিনি বললেন, আমি মাথায় আঠালো বস্তু লাগিয়েছি এবং কুরবানির পশুর গলায় মালা ঝুলিয়েছি। কাজেই কুরবানি করার পূর্বে হালাল হতে পারি না।৪০

সাহাবিরা, সামগ্রিকভাবে ইহরাম থেকে মুক্ত হতে খুব অস্বস্তি বোধ করছিলেন, কারণ তারা মদিনা থেকে হজের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন, হজ শুরু হওয়ার আগে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের ছিল না।

হযরত জাবির রা. বলেন, আমরা বের হয়ে বাতহা নামক জায়গায় গেলাম। এমতাবস্থায় একজন লোক বলতে লাগল, “আজকে আমার পরিবারের সাথে আমার সাক্ষাতের পালা।’’৪১ হযরত জাবির রা. বলেন, আমরা পরস্পর আলোচনা করতে লাগলাম। অতঃপর আমরা বললাম, আমরা হাজী হিসেবে বের হয়েছিলাম। হজ ছাড়া আমরা অন্য কিছুর নিয়ত করি নি। এমতাবস্থায় আমাদের কাছে আরাফা দিবস আসতে যখন আর মাত্র চার দিন বাকী।৪২ তখন রাসূলুল্লাহﷺ আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, যেন আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত হই। অতঃপর আমরা আমাদের আরাফার উদ্দেশ্যে (মিনাতে) গমন করব, অথচ আমাদের লিঙ্গসমূহ সবে মাত্র বীর্য স্খলিত করেছে। [অর্থাৎ এটা কেমন কাজ হবে?] বর্ণনাকারী বললেন, আমি যেন জাবির রা. কথার সাথে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখানোর ব্যাপারটি দেখতে পাচ্ছি।৪৩

হযরত জাবির রা. বলেন, বিষয়টি নবীﷺ এর কাছে পৌঁছল। আমরা জানি না এটা কি আসমান থেকে তাঁর নিকট পৌঁছল নাকি মানুষের নিকট থেকে পৌঁছল।৪৪

অতঃপর রাসূলুল্লাহﷺ দাঁড়িয়ে৪৫ মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলি বর্ণনা করে বললেন৪৬, “হে মানুষ, তোমরা কি আমাকে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছ? তোমরা জানো নিশ্চয় আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, তোমাদের চেয়ে অধিক সত্যবাদী, তোমাদের চেয়ে অধিক সৎকর্মশীল।”৪৭ “আমি তোমাদেরকে যা নির্দেশ করছি তা পালন কর।৪৮ আমার সাথে যদি হাদী (যবেহের জন্য পশু) না থাকত, তাহলে আমি অবশ্যই হালাল হয়ে যেতাম যেরূপ তোমরা হালাল হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু যতক্ষণ না হাদী তার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছবে, (অর্থাৎ দশ তারিখ হাদী যবেহ না হবে) ততক্ষণ আমার পক্ষে হারামকৃত বিষয়াদি হালাল হবে না।৪৯ যদি আমি যা পিছনে রেখে এসেছি এমন কাজগুলো আবার নতুন করে করার সুযোগ থাকত, তাহলে হাদী সাথে নিয়ে আসতাম না। অতএব, তোমরা হালাল হয়ে যাও।”৫০

হযরত জাবির রা. বললেন, আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করলাম এবং সুগন্ধি ব্যবহার করলাম। আমরা আমাদের স্বাভাবিক পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধান করলাম।৫১ আমরা রাসূলের কথা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।৫২

অতঃপর নবীﷺ নিজে এবং যাদের সাথে হাদী ছিল তারা ব্যতিত সবাই হালাল হয়ে গেল এবং চুল ছোট করল।৫৩

হযরত আবু জুহাইফা রা. যিনি সেই সময়ে মাত্র দশ বছর বয়সী ছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে একটি ঘটনার বিবরণ দেন: আমি আবতাহে নবীﷺ এর কাছে যাই। তিনি তখন একটি লাল চামড়ার তৈরি তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। হযরত বিলাল রা. তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে যোহরের সালাতের আজান দিলেন এবং তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করে রাসূলﷺ এর ওযুর অবশিষ্ট পানি নিয়ে বেরিয়ে আসেন। লোকজন তা নেওয়ার জন্য ঝাপিয়ে পড়ল। অতঃপর তিনি আবার তাঁবুতে ঢুকে একটি ছোট বর্শা নিয়ে বেরিয়ে আসলেন। নবীﷺ লাল ডোরাযুক্ত পোশাক পরে বেরিয়ে আসলেন। আমি যেন তাঁর পায়ের গোছার শুভ্রতা এখনো দেখতে পাচ্ছি। হযরত বিলাল রা. বর্শাটি সামনে পুঁতে রাখলেন। রাসূলﷺ বর্শা সামনে রেখে দু’রাকাত সালাত আদায় করলেন। বর্শার বাহির দিয়ে মহিলা ও জন্তু জানোয়ার চলাফেরা করছিল, কিন্তু তিনি বাধা দিলেন না। সালাত শেষে লোকজন দাঁড়িয়ে গেল এবং নবীﷺ এর দু’হাত ধরে তারা নিজেদের মাথা ও মুখমণ্ডলে বুলাতে লাগলো। আমিও রাসূলﷺ এর হাত ধরে আমার মুখমণ্ডলে বুলাতে লাগলাম। তাঁর হাত বরফের থেকেও স্নিগ্ধ ও কস্তুরির থেকেও বেশি সুগন্ধিময় ছিল।৫৪

এদিকে হযরত আলী রা. তার কর্মস্থল ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহﷺ এর উটগুলো নিয়ে আগমন করলেন।৫৫

তিনি হযরত ফাতিমা রা. তাদের মধ্যে পেলেন যারা হালাল হয়েছেন। এমনকি তিনি মাথা আঁচড়িয়েছেন,৫৬ রঙ্গিন পোশাক পরেছেন এবং সুরমা ব্যবহার করেছেন। তিনি হযরত ফাতিমা রা. কে এই অবস্থায় দেখে তা অপছন্দ করলেন। তিনি বললেন, তোমাকে এ রকম করার জন্য কে নির্দেশ দিয়েছে? ফাতিমা রা. বললেন, আমার পিতা আমাকে এ রকম করার নির্দেশ দিয়েছেন।৫৭

হযরত জাবির রা. বলেন, হযরত আলী রা. ইরাকে থাকা অবস্থায় বলতেন, ফাতেমার কৃতকর্মের ওপর আমি রাসূলুল্লাহﷺ কে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য তাঁর কাছে গেলাম, ফাতেমা যা রাসূলের বরাত দিয়ে বলেছেন সে সম্পর্কে তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করলাম। আমি রাসূলﷺ কে জানালাম যে, আমি ফাতেমার এই কাজকে অপছন্দ করেছি; কিন্তু সে আমাকে বলেছে, আমার পিতা আমাকে এরকম করতে নির্দেশ দিয়েছেন।৫৮ তখন রাসূলুল্লাহﷺ বললেন, “সে সত্য বলেছে, সে সত্য বলেছে, সে সত্য বলেছে, ‘আমিই তাকে এ রকম করতে নির্দেশ দিয়েছি।”৫৯

হযরত জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহﷺ আলীকে বললেন, হজের নিয়ত করার সময় তুমি কি বলেছিলে? তিনি বললেন, আমি বলেছি, “হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমি এভাবে ইহরাম বাঁধছি যেভাবে রাসূলুল্লাহﷺ ইহরাম বেঁধেছেন”।

রাসূলুল্লাহﷺ বললেন, “তাহলে আমার সাথে হাদী রয়েছে। সুতরাং তুমি হালাল হয়ো না। তুমি হারাম অবস্থায়ই থাকো যেমন আছ।”৬০

হযরত জাবির রা. বলেন, ইয়ামান থেকে হযরত আলী রা. কর্তৃক আনিত হাদী এবং মদিনা থেকে৬১ রাসূলাল্লাহﷺ কর্তৃক আনিত হাদীর মোট সংখ্যা ছিল একশত উট।৬২

৮.১আলী ইবনে আবি তালিব রা. এর আগমন~৪৫ সেকেন্ড

আবু মুসা আশ'আরী রা. ছিলেন আরেকজন সাহাবি, যিনি আবতাহে নবীﷺ এর সাথে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন: ‘নবীﷺ আমাকে ইয়েমেনের কিছু লোকের কাছে পাঠান এবং যখন আমি ফিরে আসি, তখন আমি তাঁকে আবতাহে পাই। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কী উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধেছ (অর্থাৎ হজ, উমরাহ নাকি উভয়ের জন্য)? আমি উত্তর দেই, 'আমি নবীর মতো একই উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধেছি।' তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমার সাথে কি হাদি (কুরবানির পশু) আছে?’ আমি নেতিবাচক উত্তর দিই। তিনি আমাকে কাবার চারপাশে তাওয়াফ করতে এবং ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার আগে সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ করার নির্দেশ দেন।’৬৩

যদিও তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল হজে কিরান পালন করা, যেহেতু তিনি তাঁর সাথে হাদী আনেননি, তাই নবীﷺ তাঁকে হজে তামাত্তু পালন করার নির্দেশ দেন।

৮.২আবু মুসা আশআরী রা. এর আগমন~৪৫ সেকেন্ড

জিলহজের ৭ তারিখটি ‘ইয়াওমুল জিনাহ’ (সজ্জার দিন) নামে পরিচিত ছিল, কারণ সেই দিন কুরবানির পশুগুলোকে মালা পরানো এবং সাজানো হতো। যোহরের সালাতের পর রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবিদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং তাদের পালনীয় আমল সম্পর্কে নির্দেশ দেন।৬৪

নবীﷺ আবতাহে অবস্থানের সময় কাবা পরিদর্শন করেছিলেন কিনা, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু আলেম মনে করেন যে, তিনি করেননি, আবার কেউ কেউ ইঙ্গিত দেন যে, উল্লেখিত খুতবাটি মসজিদুল হারামে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে তাওয়াফ করেছিলেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. উল্লেখ করেন যে, তিনি কাবার দিকে ফিরে যাননি। তিনি বর্ণনা করেন: রাসূলﷺ মক্কায় আসেন এবং কাবার তাওয়াফ করেন, এরপর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ করেন। তবে আরাফাহ থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি তাওয়াফের পরে কাবার কাছে যাননি।৬৫

৮.৩জিলহজের ৭ তারিখ৩০ সেকেন্ডের কম
📚তথ্যসূত্রএই অধ্যায়ের সূত্রসমূহ (৫৮টি)
  • ১. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৫৫৩, ১৫৭৩, ১৫৭৪ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২৫৭, ১২৫৮
  • ২. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৭৬৭; সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২৫৭ ও ১২৫৮; মালিক: হাদীস নং ৭১৩
  • ৩. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৭৯৮
  • ৪. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬১৪
  • ৫. ইবন মাজাহ: হাদীস নং ২৯৪৫; ইবন খুযাইমা: হাদীস নং ২৭১২ ও ২৭১৩;
  • ৬. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৫৯৭; সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২৭০
  • ৭. আবু দাউদ: হাদীস নং ১৮৮৩
  • ৮. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬২০, ১৬২১ ও ৬৭০৩
  • ৯. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬৪৪; সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২১৮ ও ১২৬১।
  • ১০. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬০২
  • ১১ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬০৫
  • ১২ আবু দাউদ: হাদীস নং ১৮৭৬
  • ১৩ বায়হাকী ৫/৭৯
  • ১৪ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬১৩
  • ১৫ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২৬৮
  • ১৬ আহমাদ, হাদীস নং ১৯০
  • ১৭ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬৩২
  • ১৮ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬০৯
  • ১৯ আবু দাউদ: হাদীস নং ১৮৯২
  • ২০-২২ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২১৮
  • ২৩ আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮৯৯; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ২৯৬২
  • ২৪ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২১৮, ১২৬২
  • ২৫-২৮ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২১৮
  • ২৯ মুসলিম ১২৬৪
  • ৩০-৩১ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২১৮
  • ৩২ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৫৬৮
  • ৩৩ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১২১৮
  • ৩৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৪১৪৮
  • ৩৫ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১৩১৮
  • ৩৬ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৪১৪৮
  • ৩৭ মুয়াত্তা, হাদীস নং ১৫৯২; বায়হাকী, হাদীস নং ৮৮৫৭
  • ৩৮ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৫২৮১
  • ৩৯ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৬; নাসাঈ, হাদীস নং ২৯৯৪
  • ৪০ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৫৬৬
  • ৪১ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৪৯৬৫
  • ৪২ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৪৯৮৫
  • ৪৩ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৬
  • ৪৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৬
  • ৪৫ শারহু মা‘আনিল আসার, হাদীস নং ৩৮৮২
  • ৪৬ ত্বা-হাবী, হাদীস নং ৩৮৮২
  • ৪৭ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৬৮
  • ৪৮ হীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৬
  • ৪৯ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৬৪
  • ৫০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৬; ত্বা-হাবী, হাদীস নং ৩৮৮২
  • ৫১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৩; নাসাঈ, হাদীস নং ২৭৬৩
  • ৫২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৬
  • ৫৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩০৭৪
  • ৫৪ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৫৫৮, ৪৩৫২-৫৪; মুসলিম: হাদীস নং ১২১৬, ১২১৮ ও ১২৫০
  • ৫৫ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৫৬ ইবনুল জারূদ ৪৬৯।
  • ৫৭-৫৮ আবূ দাঊদ, হাদীস নং ১৯০৫; বায়হাকী, হাদীস নং ৮৮২৭
  • ৫৯ নাসাঈ, হাদীস নং ২৭১২, মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৪৪৪০
  • ৬০ নাসাঈ, হাদীস নং ২৭৪৪
  • ৬১ ইবন মাজাহ্‌, হাদীস নং ৩০৭৪
  • ৬২ দারেমী, হাদীস নং ১৮৯২
  • ৬৩ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৫৫৯; মুসলিম: হাদীস নং ১২২১
  • ৬৪ ইবন খুযাইমা: সহীহ, হাদীস নং ২৭৯৩; আল-বাইহাকি: সুনান, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১১১
  • ৬৫ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১৬২৫
অধ্যায়-৩

পবিত্র হজের দিনগুলি

۞
📑আলোচ্য বিষয়সমূহনবীজীর ﷺ হজ : পবিত্র হজের দিনগুলি
  1. এই পর্বে আমরা উমরার পর হজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরব।
  2. ১. তারবিয়া দিবস (৮ই জিলহজ)
  3. ২. আরাফা দিবস (৯ই জিলহজ)
  4. ২.১ বিদায় হজের ভাষণ
  5. ২.২ যোহর ও আসর সালাত একত্রে আদায়
  6. ২.৩ জাবালে রহমতে উকুফ
  7. ২.৪ আরাফায় রাসূলﷺ এর দুআ
  8. ২.৫ আরাফা দিবসের রোজা
  9. ২.৬ একজন হাজীর মৃত্যু
  10. ২.৭ দিকনির্দেশনা প্রদান
  11. ২.৮ দীনের পরিপূর্ণতার আয়াত নাযিল
  12. ২.৯ সুসংবাদ প্রদান
  13. ২.১০ মুযদালিফার দিকে যাত্রা
  14. ৩. মুযদালিফা
  15. ৩.১ মাগরিব ও ইশার সালাত
  16. ৩.২ ছাড়সমূহ
  17. ৩.৩ রাত, ফজর সালাত ও উকুফ
  18. ৩.৪ একজন সাহাবির সাথে সাক্ষাৎ
  19. ৩.৫ মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা
  20. ৩.৬ কংকর সংগ্রহ
  21. ৪. ইয়াউমুন- নহর (১০ই জিলহজ)
  22. ৪.১ জামারাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপ
  23. ৪.২ কুরবানির দিন মিনায় খুতবা
  24. ৪.৩ প্রশ্নের উত্তর প্রদান
  25. ৪.৪ তাঁবু স্থাপনের স্থান
  26. ৪.৫ পশু কুরবানি
  27. ৪.৬ মাথা মুণ্ডন করা
  28. ৪.৭ ইহরাম থেকে হালাল হওয়া
  29. ৪.৮ তাওয়াফে যিয়ারাহ
  30. ৪.৯ যমযমের পানি পান
  31. ৪.১০ যোহরের সালাত আদায়
  32. ৪.১১ মিনায় প্রত্যাবর্তন
  33. ৫. আইয়ামুত তাশরীক- ১১ থেকে ১৩ই জিলহজ
  34. ৫.১ সালাত আদায়
  35. ৫.২ জামরাতে কংকর নিক্ষেপ
  36. ৫.৩ ছাড়সমূহ
  37. ৫.৪ তাশরীকের দিনগুলোতে প্রদত্ত ভাষণ
  38. ৫.৫ সূরা আন-নাসর অবতীর্ণ হওয়া
  39. ৫.৬ ১২ই জিলহজ
  40. ৬. মক্কা থেকে প্রস্থান
  41. ৬.১ মিনা ত্যাগ এবং মুহাসসাবে অবস্থান
  42. ৬.২ আয়িশা রা উমরা আদায়
  43. ৬.৩ তাওয়াফে বিদা
  44. ৬.৪ যমযমের পানি

রাসূলুল্লাহﷺ ৮ই জিলহজ বৃহস্পতিবার ‘আবতাহ’য় ফজর সালাত আদায় করেন এবং সূর্যোদয়ের পর উটের উপর চড়ে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

যে সব সাহাবি উমরাহ সম্পাদনের পর ইহরাম থেকে হালাল হয়ে গিয়েছিলেন, তারা হজ পালনের উদ্দেশ্যে আবতাহ ত্যাগের পূর্বে পুনরায় ইহরাম বাঁধেন।

সাহাবিগণ মিনার দিকে যাত্রার সময় তালবিয়া পাঠ করতে থাকেন।

যাত্রাপথে বিলাল রা. রাসূলুল্লাহﷺ কে সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁর বাহনের পাশে একটি লাঠি ধরেছিলেন, যার উপরে কাপড় ছিল। কাপড়টি রাসূলﷺ কে ছায়া দিচ্ছিল।

রাসূলুল্লাহﷺ এবং তাঁর সাহাবিগণ মিনায় পৌঁছান। পরদিন ফজর পর্যন্ত মিনাতেই অবস্থান করেন। রাসূলﷺ মিনাতে যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ফজর সালাত আদায় করেন। চার রাকাত বিশিষ্ট সালাতগুলো দুই রাকাতে সংক্ষিপ্ত করেন, অর্থাৎ কসর সালাত আদায় করেন এবং প্রতিটি সালাত তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করেন।

প্রসারণ: মোট পড়ার সময়: ~৫২ মিনিট
১. তারবিয়া দিবস – ৮ই জিলহজ~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড
মিনার রাস্তা, ১৯৪৫ সালমিনা , ১৮৮৯ সাল

মিনায় ফজর সালাত আদায় করার পর, রাসূলﷺ সাহাবিদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। সালাতের পর রাসূলﷺ সবাইকে তাদের নিজ নিজ স্থানে থাকতে বলেন এবং ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ শব্দগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করেন। তিনি তাশরীকের শেষ দিন আসর পর্যন্ত প্রতিটি সালাতের পর এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেন।

সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত তিনি মিনাতেই অবস্থান করেন৫ এবং তারপর আরাফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

তিনি ‘নামিরা’ নামক স্থানে তাঁর জন্য একটি পশমের তাবু স্থাপন করার নির্দেশ দেন।

মিনা থেকে আরাফায় যাওয়ার সময় তিনি 'দাব' নামক রাস্তা ব্যবহার করেন, যা মুযদালিফা থেকে আরাফাতে যাওয়ার একটি সংক্ষিপ্ত পথ।

‘দাব’ হলো মিনার মসজিদে খায়ফের পূর্ব দিকে আরাফাতের দিকে অবস্থিত একটি পাহাড়।

আরাফাতের যাত্রাপথে কিছু সাহাবি উঁচু স্বরে তালবিয়া উচ্চারণ করছিলেন, আবার কেউ কেউ তাকবীর উচ্চারণ করছিল। রাসূল ﷺ কোনোটিতেই আপত্তি করেননি।

রাসূল ﷺ এর গোত্র কুরাইশরা আশা করেছিল যে, তিনি আরাফাতের আগে মুযদালিফায় থেমে যাবেন এবং সেখানেই অবস্থান করবেন, যেমনটি জাহেলিয়াতের যুগে তাদের প্রথা ছিল। তারা অহংকার ও গর্বের কারণে এই স্থানের বাইরে যেতেন না। যেখানে অন্যান্য গোত্রের হজযাত্রীরা আরাফাতের দিকে যেতেন।

রাসূল ﷺ আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে মুযদালিফা অতিক্রম করেন।

ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

অর্থ: তারপর তোমরা সেখান থেকে ফিরে আসো, যেখান থেকে লোকেরা ফিরে আসে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান। [সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৯]

২. আরাফা দিবস – ৯ই জিলহজ~১৬ মিনিট

জাহেলিয়াতের যুগে রাসূলﷺ তাঁর গোত্রের প্রথার বিপরীতে আরাফাতে উকুফ করেছিলেন।

হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম রা. বর্ণনা করেন: আমি আমার উট হারিয়ে আরাফাতের দিন তার খোঁজে গিয়েছিলাম এবং আমি আরাফাতের লোকদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল ﷺ কে দেখি। তখন আমি বললাম: ‘আল্লাহর কসম, তিনি হুমসের (কুরাইশ) মধ্যে আছেন। তাঁকে এখানে কে নিয়ে এসেছে?

রাসূলﷺ আরাফাতের ঠিক আগে 'নামিরা' নামক স্থানে পৌঁছান এবং দেখতে পেলেন নামিরায় তার জন্য তাবু খাটানো হয়েছে।১০ তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। তাঁর স্ত্রীগণ তাঁর চারপাশের তাঁবুতে অবস্থান করেন।

যখন সূর্য (পশ্চিমকাশে) ঢলে পড়ল, তখন তাঁর উষ্ট্রী কাসওয়াকে প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। তার পিঠে হাওদা লাগানো হল। তিনি বাতুনে ওয়াদীতে এলেন এবং লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন।১১ এটি ছিল একটি প্রশস্ত স্থান, যেখানে সাহাবিগণ তাঁর চারপাশে জড়ো হতে সক্ষম হন। তিনি উপত্যকার নিচে পৌঁছান এবং তাঁর লাল উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দুই পাদানিতে পা রেখে দাঁড়িয়ে সাহাবিদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।১২

এই ভাষণটি ‘খুতবাতুল বিদা / বিদায় ভাষণ’ নামে পরিচিত।

বর্তমানে, এই স্থানে ‘মসজিদে নামিরা’ নামে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। মসজিদের সামনের অংশ, যা আরাফাতের সীমানা অতিক্রম করে, সেখানেই রাসূল ﷺ ভাষণ দেন এবং এরপর যোহর ও আসরের সালাত একত্রিত করে আদায় করেন।

হজের রাস্তাসমূহের মানচিত্র, ১৯০৮ সাল

আরাফা ময়দানের ছবি

রাসূল ﷺ আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণার পর লোকদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেন,

“নিশ্চয় তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য সম্মানিত। যেমন তোমাদের এই শহরে, তোমাদের এই মাসে, তোমাদের এই দিন সম্মানিত। জেনে রাখো! নিশ্চয় জাহিলিয়াতের প্রত্যেকটি বিষয় আমার এই দুই পায়ের তলে রাখা হয়েছে। জাহিলি যুগের যাবতীয় রক্তের দাবি রহিত করা হলো। আমাদের রক্তের দাবিসমূহের মধ্যে প্রথম রক্তের দাবি যা রহিত করা হলো, তা ইবন রবী‘আ ইবনুল-হারিসের রক্তের দাবি। সে সা‘দ গোত্রে দুধ পানরত অবস্থায় ছিল। হুযাইল গোত্র তাকে হত্যা করেছিল।

জাহেলি যুগের সুদ রহিত করা হল। সর্বপ্রথম যে সুদের দাবি রহিত করছি তা হলো আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ। তা পরিপূর্ণরূপে রহিত করা হলো।

আর তোমরা স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের লজ্জাস্থানসমূহকে আল্লাহর বাণী দ্বারা হালাল করে নিয়েছ।

নিশ্চয় তোমাদের ব্যাপারে তাদের ওপর দায়িত্ব হচ্ছে, তারা যেন তোমাদের বিছানাসমূহকে এমন কোনো ব্যক্তি দ্বারা পদদলিত না করে যাকে তোমরা অপছন্দ কর । যদি তারা তা করে, তোমরা তাদেরকে মৃদুভাবে প্রহার কর।

আর তাদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর দায়িত্ব হচ্ছে, উত্তম পন্থায় তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাক-পরিচ্ছেদের ব্যবস্থা করা।

আমি তোমাদের মাঝে এমন এক জিনিস রেখে যাচ্ছি- যা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব।’’১৩

‘‘হে লোকসকল! আল্লাহর কসম, আমি জানিনা আজকের পরে আর কোনোদিন তোমাদের সঙ্গে এই স্থানে মিলিত হতে পারব কি-না। অতএব আল্লাহ রহম করুন ঐ ব্যক্তির উপরে যে ব্যক্তি আজকে আমার কথা শুনবে ও তা স্মরণ রাখবে। কেননা অনেক জ্ঞানের বাহক নিজে জ্ঞানী নয় (সে অন্যের নিকট জ্ঞান বহন করে নিয়ে যায়) এবং অনেক জ্ঞানের বাহক তার চাইতে অধিকতর জ্ঞানীর নিকটে জ্ঞান বহন করে নিয়ে যায়।

২.১বিদায় হজের ভাষণ~৩ মিনিট

মসজিদে নামিরার পুরাতন একটি ছবি, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় ভাষণ দেন

জেনে রেখ, তিনটি বিষয়ে মুমিনের অন্তর খিয়ানত করে না : (১) আল্লাহর উদ্দেশ্যে এখলাছের সাথে কাজ করা। (২) শাসকদের জন্য কল্যাণ কামনা করা এবং (৩) মুসলমানদের জামা‘আতকে আঁকড়ে ধরা। কেননা তাদের দুআ তাদেরকে পিছন থেকে (শয়তানের প্রতারণা হ’তে) রক্ষা করে।’’১৪

‘আমি কি তোমাদেরকে মুমিন সম্পর্কে খবর দিব না? সে ওই ব্যক্তি যার হাত থেকে অন্যদের মাল ও জান নিরাপদ থাকে। আর মুসলিম সেই, যার যবান ও হাত থেকে অন্যেরা নিরাপদ থাকে। আর মুজাহিদ সেই, যে আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত করে এবং মুহাজির সেই, যে সকল প্রকার অন্যায় ও পাপকর্ম সমূহ পরিত্যাগ করে।’’১৫

‘শুনে রাখো! আমি তোমাদের আগেই হাওযে কাওসারে উপস্থিত থাকবো। অন্যান্য উম্মাতের তুলনায় তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে আমি গৌরব করবো। তোমরা যেন আমার চেহারা কালিমালিপ্ত না করো। সাবধান! কিছু লোককে আমি মুক্ত করতে পারবো, আর কিছু লোককে আমার নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়া হবে। তখম আমি বলবো, হে আল্লাহ! এরা তো আমার সাহাবি! তিনি বলবেন, তোমার পরে এরা কী বিদআতী কাজ করেছে, তা তুমি জানো না।’১৬

‘আজকে কোন দিন? লোকেরা বলল, হজে আকবারের দিন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম। যেমন এই দিন ও এই শহর তোমাদের জন্য হারাম। মনে রেখ, অপরাধের শাস্তি অপরাধী ব্যতীত অন্যের উপরে বর্তাবে না। পিতার অপরাধের শাস্তি পুত্রের উপর এবং পুত্রের অপরাধের শাস্তি পিতার উপর বর্তাবে না। হে লোকেরা, জেনে রাখো, শয়তান তোমাদের এই ভূমিতে পূজিত হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু সে যদি কোনো ছোট মন্দ কাজে আনুগত্য পায়, যা তোমরা তুচ্ছ মনে করো, তাতে সে সন্তুষ্ট। তার থেকে নিজেদের রক্ষা করো, যাতে সে তোমাদের ঈমান নষ্ট না করে। নিশ্চয়ই, প্রত্যেক মুসলিম একজন মুসলিমের ভাই। সমস্ত মুসলিম ভাই। একজন মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় যা দিয়েছে, তা ছাড়া অন্য কিছু নেওয়া বৈধ নয়, তাই তোমরা যুলুম করো না।’১৭

আমার ব্যাপারে তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, তখন তোমরা কি বলবে? তারা বলল, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় আপনি আপনার রবের বাণীসমূহ পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, অর্পিত দায়িত্ব আদায় করেছেন, উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তাঁর শাহাদাত আঙ্গুলি আকাশের দিকে তুলে মানুষের দিকে ইশারা করে বললেন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন।”১৮

উল্লেখ্য যে, আরাফাতের ময়দানে রাসূলﷺ এর উক্ত ভাষণ উচ্চকণ্ঠে জনগণকে শুনিয়েছিলেন রাবী‘আহ বিন উমাইয়া বিন খালাফ রা.।১৯ আল্লাহর কি অপূর্ব মহিমা! মক্কায় হযরত বেলালের উপরে লোমহর্ষক নির্যাতনকারী, রাসূলﷺ -কে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ১৪ নেতার অন্যতম নিকৃষ্টতম নেতা ও বদর যুদ্ধে নিহত উমাইয়া বিন খালাফের ছেলে রাবী‘আহ রা. আজ রাসূল ﷺ এর দেহরক্ষী সাহাবি ও তাঁর বিদায়ী ভাষণ প্রচারকারী।

ভাষণের পর হযরত বিলাল রা. একবার আযান দিলেন। অতঃপর ইকামত দিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাহাবিগণ যোহরের সালাত আদায় করলেন।

হযরত বিলাল রা. পুনরায় ইকামত দিলেন। রাসূলুল্লাহﷺ আসরের সালাতও আদায় করলেন।

যোহর ও আসর উভয় সালাত কসর করেন অর্থাৎ দুই রাকাত করে আদায় করেন।

রাসূল ﷺ দুই সালাতের মধ্যে কোনো নফল সালাত (সুন্নাত) আদায় করেননি, বরং একটি আযান এবং দুটি ইকামাতের মাধ্যমে যোহরের সময়ে উভয় সালাত একত্রে আদায় করেন।”২০

১৯৫০ সালে জাবালে রহমতে হজযাত্রীগণ

২.২যোহর ও আসর সালাত একত্রে আদায়~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড
আরাফা ময়দানের ছবি

সালাত শেষে রাসূলুল্লাহ ﷺ ‘কাসওয়া’ নামক উটের পিঠে আরোহন করেন এবং আরাফাতের উপত্যকার আরও গভীরে, জাবালে রহমতের দিকে যাত্রা করেন।

তিনি পাহাড়ের পাদদেশে এসে থামেন । তাঁর বাহন কাসওয়ার পেট বড় বড় পাথরের দিকে ফিরিয়ে রাখলেন এবং যারা পায়ে হেঁটে তাঁর সাথে এসেছিলেন, তিনি তাদের সকলকে তাঁর সামনে রাখলেন। অতঃপর কিবলামুখী হলেন।

তিনি সেখানেই উকুফ (দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে অবস্থান) করতে থাকলেন, এমনকি সূর্য ডুবে গেল, পশ্চিম আকাশের হলুদ আভা ফিকে হয়ে গেল, এমনকি লালিমাও দূর হয়ে গেল।২১

রাসূল ﷺ লোকদেরকে তাদের স্ব স্ব স্থানে অবস্থান করতে বললেন। তিনি সাহাবি ইবনে মিরবা আনসারী রা. কে আরাফাতের লোকদের বলতে নির্দেশ দেন: তোমরা তোমাদের জায়গাতেই অবস্থান কর, কেননা তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আ)-এর বিধানের উপর রয়েছ।২২

রাসূল ﷺ বলেন, “আমি এখানে দাঁড়িয়েছি এবং আরাফাতের পুরোটাই দাঁড়ানোর স্থান।২৩

(ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ লেখেন: আরাফাতের পুরোটাই উকুফের স্থান, যদিও এর সর্বোত্তম স্থান হলো রাসূল ﷺ এর উকুফের (অবস্থানের) স্থান, যা আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের পাদদেশে স্থাপিত বড় কংকরগুলোর কাছে।)২৪

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব, আবদুল্লাহ ইবনে উমর এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর মতো কিছু সাহাবি আরাফাতে উকুফের প্রস্তুতির জন্য গোসলও করেছিলেন। নাফি রা. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ইহরামের আগে, মক্কায় প্রবেশের আগে এবং আরাফাতের বিকেলে দাঁড়ানোর জন্য গোসল করতেন।২৫

২.৩জাবালে রহমতে অবস্থান~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড
আরাফা ময়দানের ছবি

রাসূল ﷺ মধ্যাহ্ন থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উটের উপর বসে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তাঁর উট একদিকে হেলে পড়ল এবং লাগাম পড়ে যেতে লাগলো। তিনি এক হাতে লাগাম তুলে নেন, অন্য হাতটি তখনও দুআর জন্য তোলা ছিল।২৬

রাসূল ﷺ নিজের এবং তাঁর উম্মতের জন্য দুআ করেন এবং তিনি বলেন, আরাফার দিনের দুআ সর্বোত্তম দুআ। আর আমি এবং আমার পূর্ববর্তী রাসূলরা যা বলেছি, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো:

لَآ إِلٰهَ إِلاَّ اللّٰهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।২৭

হযরত আলী রা. থেকে আরেকটি বর্ণনায় পূর্বের দুআ সঙ্গে নিচের দোয়াটি যুক্ত করা হয়েছে:

اللّٰهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورَاً وَفِي سَمْعِي نُورَاً وَفِي بَصَرِي نُورَاً اللّٰهُمَّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ وَسَاوِسِ الصُّدُورِ وَشَتَاتِ الْأَمْرِ وَفِتْنَةِ الْقَبْرِ اللّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا يَلِجُ فِي اللَّيْلِ وَشَرِّ مَا يَلِجُ فِي النَّهَارِ وَشَرِّ مَا تَهِبُّ بِهِ الرِّيَاحُ ❁

অর্থ: হে আল্লাহ, আমার হৃদয়কে আলোকিত করুন, আমার শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তিকে আলোকিত করুন। হে আল্লাহ, আমার হৃদয় খুলে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হৃদয়ের কুমন্ত্রণা, কাজের বিশৃঙ্খলা এবং কবরের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে রাতের ও দিনের বেলায় ঘটা অমঙ্গল এবং বাতাসের সঙ্গে আসা অমঙ্গল থেকে আশ্রয় চাই।২৮

রাসূলﷺ আরাফাতে দিনের তৃতীয় প্রহরে উম্মাতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে দুআ করেন। জবাবে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তাঁকে জানানো হয় আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম, স্বৈরাচারী যালেম ব্যতীত। কারণ আমি অবশ্যই তার উপর নির্যাতিতের প্রতিশোধ নিবো। রাসূল ﷺ বলেন, হে রব! আপনি ইচ্ছা করলে নির্যাতিত ব্যক্তিকে জান্নাত দান করতে এবং যালেমকে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু রাত পর্যন্ত এর কোন জবাব পাওয়া গেলো না। ভোরবেলা তিনি মুযদালিফায় পুনরায় উপরোক্ত দুআ করেন। হাদিসটি যইফ।২৯

দুআর পাশাপাশি, রাসূল ﷺ আরাফার দিনে উকুফের সময় তালবিয়া পাঠ করতে থাকেন।

২.৪আরাফাতের ময়দানে রাসূলﷺ এর দুআ~৩০ সেকেন্ড

১৯০৭ সালের আরাফা ময়দানের ছবি

রাসূলﷺ সারা দিন ধরে আন্তরিক প্রার্থনা ও দু’আয় মগ্ন ছিলেন। তাঁর এই একনিষ্ঠতা দেখে সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ হয় যে তিনি রোজা রেখেছেন কিনা। উম্মুল ফাযল বিনতু হারিস রা থেকে বর্ণিত যে, লোকেরা আরাফার দিন তার নিকট রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সিয়াম (রোজা) পালন (করা না করা) সম্পর্কে আলোচনা করছিল। তাদের কেউ কেউ বলল, তিনি সওমরত নন। এরপর আমি তার নিকট এক পেয়ালা দুধ পাঠালাম, তিনি আরাফাতে উটের উপর বসা অবস্থায় ছিলেন। তিনি দুধটুকু পান করে নিলেন। অর্থাৎ রাসূল ﷺ আরাফার ময়দানে রোজা রাখেননি।৩০

২.৫আরাফা দিবসের রোজা~৩০ সেকেন্ড

বিকেলের দিকে এক হজযাত্রী, যার নাম বা গোত্র জানা যায়নি, উট থেকে পড়ে মারা যান। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন: আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সফরসঙ্গী এক ব্যক্তি আরাফাতে তার বাহন থেকে পড়ে গিয়ে ঘাড় ভেঙে মারা যান। নবী ﷺ বললেন,

‘তাকে কুলগাছের পাতা দিয়ে সিদ্ধ পানি দ্বারা গোসল দাও এবং তার দুই ইহরামের কাপড়ে কাফন দাও। তাঁর শরীরে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তাঁর মাথা ঢাকবে না, কেননা সে কিয়ামতের দিনে তালবিয়া পাঠ করতে করতে পুনরুত্থিত হবে।’৩১

তাকে সুগন্ধি না দেয়া এবং মাথা না ঢাকার কারণ ছিল এই যে, তিনি ইহরামের অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন।

২.৬একজন হাজীর মৃত্যু~২ মিনিট

রাসূল ﷺ সাহাবিদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন। নাজদের একদল লোক তাঁকে হজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তিনি বলেন, “হজ হচ্ছে আরাফাতে অবস্থান, হজ হচ্ছে আরাফাতে অবস্থান, হজ হচ্ছে আরাফাতে অবস্থান। যে ব্যক্তি মুযদালিফার রাতে ফজরের নামাজের পূর্বেই আরাফাতে আসে, তার হজ সম্পন্ন হয়েছে।”৩২

নবী ﷺ এর উত্তর নিশ্চিত করে যে, ৯ই জিলহজের মধ্যাহ্ন থেকে পরের দিনের ভোর পর্যন্ত যেকোনো সময় আরাফাতে উপস্থিত থাকা যেকোনো হজযাত্রীর হজ আদায় হয়েছে বলে গণ্য হবে।

কায়স আইলান গোত্রের একজন বেদুইন হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুনতাফিক রা. রাসূল ﷺ কে খুঁজতে থাকেন যতক্ষণ না তিনি তাঁকে আরাফাতে পান। তিনি বর্ণনা করেন: আমি রাসূল ﷺ এর কাছে পৌঁছানোর জন্য ভিড়ের মধ্য দিয়ে যাই, কিন্তু লোকেরা আমাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বলেন, ‘লোকটিকে যেতে দাও; তার কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে।’ আমি ভিড়ের মধ্য দিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছাই এবং তাঁর উটের লাগাম ধরি। আমাদের দুটি উটের ঘাড় বিপরীত দিকে একে অপরের সাথে স্পর্শ করে। তিনি অবস্থান পরিবর্তন করেননি। ‘আমি দুটি জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি - কী আমাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে এবং কী আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে?’ তিনি আকাশের দিকে তাকান, তারপর তাঁর মহিমান্বিত চেহারা দিয়ে আমার দিকে ফিরে বলেন, ‘তুমি সংক্ষিপ্তভাবে তোমার প্রশ্ন করেছ, যদিও তুমি অসাধারণ কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ। আমার কথা শোনো এবং আমি যা বলছি তা বোঝো। আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে কোনো শরীক করো না। তোমার নামাজের যত্ন নাও, তোমার যাকাত (অর্থাৎ, বাধ্যতামূলক দান) দাও এবং রমজানে রোজা রাখো। মানুষের কাছ থেকে তুমি যা ভালো আশা করো, তাদের সাথে ঠিক সেইভাবে আচরণ করো; এবং তাদের কাছ থেকে তুমি যা ঘৃণা করো, তার প্রতিশোধ নিও না। এখন আমার উটের লাগাম ছেড়ে দাও।’৩৩

২.৭দিকনির্দেশনা প্রদান~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

এই দিনে রাসূল ﷺ এর উপর নিম্নলিখিত আয়াত নাযিল হয়। রাসূল ﷺ তখন আরাফার ময়দানে জাবালে রহমতে দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন।

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ❁

অর্থ: আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম। [সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩]

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এই আয়াত শুনে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলﷺ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কেন কাঁদছেন। উমর রা. বলেন, “যা আমাকে কাঁদিয়েছে তা হলো, আমাদের ধর্ম আমাদের জন্য পরিপূর্ণ করা হয়েছে। এখন এটি পরিপূর্ণ, এটি অবশ্যই খারাপ হবে, কারণ কিছুই পরিপূর্ণ থাকে না।” রাসূলﷺ উত্তর দেন: “তুমি সত্য বলেছ।”৩৪

সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ আগে রাসূল ﷺ হযরত বিলাল রা. কে লোকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বলেন।

সাহাবিরা রাসূল ﷺএর চারপাশে জড়ো হলে তিনি বলেন, “হে লোকেরা, জিবরীল আলাইহিস সালাম কিছুক্ষণ আগে আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমার রবের পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ আরাফাত এবং মাশ’আরের (অর্থাৎ মুযদালিফা) লোকদের ক্ষমা করেছেন এবং তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।”

হযরত উমর রা. জিজ্ঞাসা করেন: “হে আল্লাহর রাসূল, এটি কি বিশেষভাবে আমাদের জন্য প্রযোজ্য?” রাসূলﷺ বলেন, “এটি তোমাদের জন্য এবং কিয়ামত পর্যন্ত তোমাদের পরে যারা আসবে, তাদের সবার জন্য প্রযোজ্য।” উমর বলেন, “আল্লাহর অনুগ্রহ কত সুন্দর এবং উদার।”৩৫

২.৯সুসংবাদ প্রদান৩০ সেকেন্ডের কম
২.৮দীনের পরিপূর্ণতার আয়াত নাযিল হওয়া~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

সূর্যাস্তের পর আলো কিছুটা কমে গেলে রাসূল ﷺ উসামা ইবনে যায়েদ রা. কে তাঁর পিছনে বসিয়ে৩৬ ‘আল-মা’জিমাইন’ হয়ে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা ত্যাগ করেন। ‘আল-মা’জিমাইন’ হলো আরাফাত এবং মুযদালিফার মধ্যে দুটি পাহাড়, বর্তমানে যা ‘আল-আখশাবাইন’ নামে পরিচিত।

সূর্যাস্তের পর আরাফা থেকে রাসূলুল্লাহﷺ এর প্রস্থান মুশরিকদের আচারের সাথে ভিন্নতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ছিল। কেননা মুশরিকরা সূর্যাস্তের আগেই আরাফা ত্যাগ করতো। রাসূলﷺ বলেছেন, আমাদের আদর্শ তাদের থেকে ভিন্ন।

‘’যাত্রার শুরুতে তিনি ডান হাত উপরে তোলেন এবং তালু উপরের দিকে রেখে বলেন, “লোকেরা, শান্ত থাকো এবং ধীরে ধীরে চলো।”

রাসূলﷺ তার পিছনের দিকে খুব হাঁকডাক ও উট পিটানোর শব্দ শুনতে পেয়ে তাদের চাবুক দিয়ে ইশারা করে বলেন, হে লোক সকল! তোমরা ধীরস্থিরতা অবলম্বন কর। কেননা উট দ্রুত হাঁকানোর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।

তিনি সাহাবিদের গাম্ভীর্য সহকারে চলতে বলেন।

রাসূল ﷺ উটকে নিয়ন্ত্রনের জন্য লাগাম শক্তভাবে টেনে ধরলেন, এমনকি উটের মাথা তাঁর হাওদার সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। কোন টিলা অতিক্রমের সময় উটের লাগাম শিথিল করে ধরতেন, যাতে উটটি সহজে তা অতিক্রম করতে পারে।

রাসূল ﷺ তাঁর উটকে মধ্যম গতিতে চালিয়েছিলেন, যখন খোলা জায়গা পেতেন তখন দ্রুতগতিতে হাকাতেন।

যাত্রা পথে রাসূলﷺ প্রচুর তালবিয়া পাঠ করেন।’’৩৭

তিনি মুযদালিফার কাছে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী রাস্তার বাম দিকে শি’ব আল-ইদখিরে পৌঁছান এবং উট থেকে নেমে একটি নিচু স্থানে যান। সেখানে তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারেন। ফিরে এলে উসামা রা. তাঁকে পানি সরবরাহ করেন, যা দিয়ে তিনি হালকা ওযু করেন। (প্রতি অঙ্গ একবার করে ধৌত করেন)। হযরত উসামা রা. জিজ্ঞাসা করেন যে, তারা সালাতের জন্য থামবে কি না, উত্তরে রাসূলﷺ বলেন, “সালাতের স্থান তোমাদের সামনে (মুযদালিফায়)।”৩৮

২.১০মুযদালিফার দিকে যাত্রা~১ মিনিট

রাসূলﷺ এর প্রতি তাঁদের গভীর ভালোবাসার কারণে, সাহাবিগণ তিনি যা করতেন, তার সবকিছু অনুকরণ করতে চাইতেন। হযরত আনাস ইবনে সিরিন রা. বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. সাথে আরাফাতে ছিলাম এবং যখন তিনি বিশ্রাম নেন, তখন আমিও তাঁর সাথে বিশ্রাম নেই, যতক্ষণ না ইমাম আসেন এবং তিনি তাঁর সাথে যোহর ও আসর আদায় করেন। তারপর তিনি তাঁর সাথে উকুফ করেন, যেমনটি আমি এবং আমার কিছু সঙ্গী করি, যতক্ষণ না ইমাম (আরাফাত থেকে মুযদালিফার দিকে) যাত্রা করেন। আমরা তাঁর সাথে চলতে থাকি যতক্ষণ না আমরা আল-মা’জিমাইনের কাছে একটি সরু পথে পৌঁছাই, যেখানে তিনি তাঁর উট থামান এবং আমরাও থামি, কারণ আমরা ভেবেছিলাম, তিনি সালাত পড়তে চান। তাঁর ভৃত্য, যে তাঁর পশুটি ধরে ছিল, সে বলে, ‘তিনি সালাত পড়ার ইচ্ছা রাখেন না, তবে তাঁর মনে পড়ে যে, রাসূলﷺ যখন এই স্থানে পৌঁছেছিলেন, তখন প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরেছিলেন, তাই তিনি (ইবনে উমর) এখানে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে ভালোবাসেন।৩৯

রাসূলﷺ মুযদালিফায় পৌঁছানোর পর বর্তমান ‘মসজিদে মাশআরে হারামের’ স্থানে অবস্থান করেন, যা ‘কুযাহ’ পর্বতের খুব কাছে অবস্থিত।

রাসূলﷺ তাঁর সাহাবিদের নির্দেশ দেন: “মুহাসসির উপত্যকা ছাড়া মুযদালিফার পুরো স্থানই দাঁড়ানোর স্থান।”৪০

১৯০৮ সালে মসজিদে মাশ’আরে হারাম

৩. মুযদালিফা~৮ মিনিট

রাসূলﷺ উট থেকে নেমে ওযু করেন এবং হযরত বিলাল রা. কে আযান দিতে নির্দেশ দেন। তিনি এবার সম্পূর্ণ ওযু করেন, এর আগে মুযদালিফার পথে হালকা ওযু করেছিলেন।৪১

রাসূলﷺ এবং তাঁর সাহাবিগণ মুযদালিফায় একটি আযান ও দুইটি ইকামাতের মাধ্যমে মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে ইশার সময় আদায় করেন এবং সালাত কসর (সংক্ষিপ্ত) করেন৷ মাগরিব ও ইশার মধ্যে কোনো নফল সালাত (সুন্নাত) আদায় করেন নি।৪২

মাগরিবের সালাতের পর সকলে তাদের অবতরণস্থলে নিজ নিজ উট বসিয়ে দিল। পুনরায় ’ইশার ইকামত দেয়া হল। অতঃপর সকলে ঈশার সালাত আদায় করলেন।৪৩ সালাত শেষ হওয়ার পর, লোকেরা উট থেকে তাদের জিনিসপত্র বের করে আনে।

রাসূলﷺ দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য ছাড় দিয়েছিলেন। যেমন নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ। তাদেরকে সকালের ভিড় এড়াতে রাতের বেলায় মুযদালিফা থেকে মিনার দিকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা আরও সহজে রামি/কংকর নিক্ষেপ করতে পারে।

হযরত আয়িশা রা. বর্ণনা করেন: সাওদা বিনতে জামা রা. (রাসূলﷺ এর স্ত্রী। যিনি বৃদ্ধ এবং ধীরগতির ছিলেন) লোকদের ভিড়ের আগে তাড়াতাড়ি রওয়ানা হওয়ার জন্য রাসূলﷺ এর কাছে অনুমতি চান। রাসূল ﷺ অনুমতি দেন। তাই তিনি (মুযদালিফা থেকে) লোকদের ভিড়ের আগে রওয়ানা হন। আমরা মুযদালিফায় ভোর পর্যন্ত থাকি এবং রাসূল ﷺ এর সাথে রওয়ানা হই, কিন্তু আমি এতটাই কষ্ট পাই যে, আমি কামনা করি, আমি যদি আল্লাহর রাসূল ﷺ এর কাছ থেকে সাওদার মতো অনুমতি নিতাম এবং তা আমার কাছে অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে প্রিয় হতো।৪৪

৩.১মাগরিব ও ইশার সালাত৩০ সেকেন্ডের কম
৩.২ছাড়সমূহ~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড
মুযদালিফা, ১৮৮৭ সাল

রাসূল ﷺ ইশার সালাতের পর থেকে ফজরের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্রাম নেন। রাতে তিনি অন্য কোন ইবাদত করেন নি।৪৫

শনিবার ১০ই জিলহজ ভোরে রাসূলﷺ ফজরের সালাতের সময় শুরু হওয়ার সাথে সাথে আযান এবং ইকামাতের মাধ্যমে ফজরের সালাত আদায় করেন। তিনি সাধারণত যে সময়ের সাথে অভ্যস্ত ছিলেন, তার থেকে সামান্য আগে সালাত আদায় করেন।৪৬

সালাত শেষ করার পর তিনি তাঁর উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করেন এবং ‘কুযাহ’ পর্বতে ওঠেন, যা মসজিদের দিকে মুখ করে ছিল। রাসূলﷺ বলেন, ‘এটি কুযাহ এবং এটাই অবস্থানস্থল। মুযদালিফার গোটা এলাকাই অবস্থানের স্থান।’৪৭ তিনি কিবলার দিকে মুখ করেন এবং আলো না হওয়া পর্যন্ত দু’হাত তোলে দু'আ করতে থাকেন। রাসূলﷺ আল্লাহর শুকরিয়া, প্রশংসা ও মহিমা বর্ণনা করেন, সেইসাথে তালবিয়া পাঠ করেন, যা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নির্দেশ পূরণ করে:

فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِندَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ

যখন তোমরা আরাফাত থেকে ফিরে আসো, তখন মাশআরে হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করো। [সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৮]

এই দু'আর সময় রাসূল ﷺ আনন্দের হাসি দিলেন অথবা মুচকি হাসলেন। হযরত আবূ বকর রা. ও উমার রা. তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক! আপনি এ হজের সময় কখনও হাসেননি, আজ কোন জিনিস আপনাকে হাসালো? আল্লাহ আপনাকে হাসিমুখে রাখুন। তিনি বলেন, আল্লাহর দুশমন ইবলীস যখন জানতে পারলো যে, মহামহিম আল্লাহ আমার দু'আ কবুল করেছেন এবং আমার উম্মাতকে ক্ষমা করেছেন, তখন সে গুড়া মাটি তুলে নিজের মাথায় ঢালতে ঢালতে বলতে লাগলো, হায় সর্বনাশ, হায় ধ্বংস। আমি ওর যে অস্থিরতা দেখেছি তা আমাকে হাসিয়েছে।৪৮ [হাদিসটি যইফ]

আরাফাতের ময়দানে উম্মতের জন্য করা রাসূল ﷺ এর দু'আ মুযদালিফায় কবুল হয়েছিল।

৩.৩রাত, ফজর সালাত ও উকুফ~৩০ সেকেন্ড

একজন সাহাবি হযরত উরওয়া ইবনে মুদাররিস রা. বলেন, আমি মুযদালিফায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট এসে বলি, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ’তায়ী’ পাহাড় থেকে আগমন করেছি। আমার সওয়ারী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবং আমি নিজেও ক্লান্ত। আল্লাহর শপথ! আমি চলার পথে যে পাহাড়ই পেয়েছি, তার উপর কিছুক্ষণ অবস্থান করেছি। আমার হজ কি বৈধ হয়েছে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের সাথে (কুরবানির দিন) এ স্থানে ফজরের সালাত আদায় করেছে এবং এর পূর্ব রাতে বা দিনে আরাফায় উপস্থিত হয়েছে, তার হজ পরিপূর্ণ হয়েছে এবং তার উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে।’৪৯

৩.৪একজন সাহাবির সাথে সাক্ষাৎ~২ মিনিট

রাসূল ﷺ সূর্যোদয়ের ঠিক পূর্বে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ফজল ইবনে আব্বাস রা. উটের উপর তাঁর পিছনে বসা ছিলেন।৫০

রাসূল ﷺ এর সূর্যোদয়ের আগে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হওয়া মুশরিকদের বিপরীত ছিল। তারা সূর্যোদয়ের পরে রওয়ানা হতো। রাসূল ﷺ বলেন, “তারা মুযদালিফা থেকে যাত্রা করত যখন সূর্যের আলো পাহাড়ের চূড়ায় পুরুষদের পাগড়ির মতো দেখা যেত। আমাদের পদ্ধতি তাদের থেকে ভিন্ন।”

মুশরিকরা বলত, “হে সাবির! (মুযদালিফার একটি পাহাড়), আলোকিত হও, আমরা প্রত্যাবর্তন করবো।” রাসূল ﷺ এই প্রথা পরিবর্তন করেন।৫১

রাসূল ﷺ পরিমিত গতিতে চলেন এবং সাহাবিদের শান্ত থাকতে নির্দেশ দেন। উসামা ইবনে যায়েদ রা.সহ কুরাইশের কিছু উৎসাহী এবং সুস্থ যুবক মিনার দিকে দৌড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, যা বাকি হজযাত্রীদের আগে তাদের গন্তব্যে পৌঁছায়।

যাত্রার সময় খাস’আম গোত্রের একজন মহিলা রাসূলﷺ কে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য তাঁর কাছে আসেন। ফযল ইবনে আব্বাস রা. (প্রায় ২০ বছর বয়সী একজন সুদর্শন যুবক, সুন্দর চুল এবং ফর্সা বর্ণের) মহিলার দিকে তাকাতে থাকে, মহিলাটিও তাঁর দিকে তাকাতে থাকে। রাসূলﷺ হাত দিয়ে ফযলের চেহারা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। রাসূলﷺ কে সম্বোধন করে মহিলাটি জিজ্ঞাসা করেন: “আমার পিতার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে হজ আদায় করা বাধ্যতামূলক হয়েছে, কিন্তু তিনি খুব বৃদ্ধ এবং বাহনের উপর ঠিকমতো বসতে পারেন না। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ আদায় করব? রাসূল ﷺ বললেন, হ্যাঁ (আদায় করো)।৫২

একইভাবে, একজন লোক রাসূলﷺ কে জিজ্ঞাসা করেন: “আমার মা একজন বৃদ্ধ মহিলা এবং তিনি জিন-এর উপর শক্তভাবে বসতে পারেন না। যদি আমি তাঁকে বাহনের সাথে বেঁধে রাখি, তবে আমার ভয় হয় যে, আমি তাঁকে হত্যা করতে পারি।” আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “তুমি কি মনে করো না যে, যদি তোমার মায়ের ঋণ থাকত, তবে তুমি তা পরিশোধ করতে?” তিনি বলেন, “হ্যাঁ।” তিনি বলেন, “তাহলে তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ আদায় করো।”৫৩

রাসূলﷺ মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে ‘মুহাসসির’ উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম করেন। তিনি তাঁর উটকে হালকাভাবে খোঁচা দেন, যাতে এটি দ্রুত চলে। কেননা এই স্থানেই আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কা ধ্বংস করার জন্য কাবার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আল্লাহর প্রেরিত বাহিনী দ্বারা ধ্বংস হয়েছিল। রাসূল ﷺ যেখানে আল্লাহর বিরোধীরা তাঁর ক্রোধের শিকার হয়েছিল, সেখানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করতেন না।৫৪

৩.৫মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা~৪৫ সেকেন্ড
মিনা, ১৮৮৯ সাল

মুহাসসির উপত্যকায় রাসূলﷺ তাঁর চাচাতো ভাই ফযল ইবনে আব্বাস রা. কে জামরাতুল আকাবার রামি করার উদ্দেশ্যে তাঁর জন্য কিছু কংকর সংগ্রহ করতে নির্দেশ দেন। ফযল রা. খেজুর বীজের আকারের সাতটি কংকর সংগ্রহ করেন এবং তা আকারে ক্ষুদ্র ছিল। রাসূলﷺ কংকরগুলো হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলেন, “এই ধরনের কংকর দিয়ে রামি করো। হে লোকেরা, ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি থেকে সাবধান, কারণ তোমাদের আগে যারা ছিল, তারা ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণে ধ্বংস হয়েছিল।৫৫

রাসূল ﷺ মুহাসসির থেকে মিনার দূর প্রান্তে অবস্থিত জামরাতুল আকাবার দিকে যাওয়া মধ্যবর্তী পথটি ধরেন, সূর্যোদয়ের পরে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছান। মধ্যবর্তী পথ বলতে দাব এবং আল-মা’জিমাইনের পথের মধ্যবর্তী পথকে বোঝায়।

৩.৬কংকর সংগ্রহ~১ মিনিট
কংকরকংকর

১০ই জিলহজ সকালের মাঝামাঝি সময়ে রাসূল ﷺ গাছের সন্নিকটে অবস্থিত জামরাতুল আকাবায় পৌঁছান এবং এমনভাবে অবস্থান নেন যেখানে মিনা তাঁর ডানদিকে এবং মক্কা তাঁর বামদিকে ছিল। তিনি উটের উপর বসা অবস্থায় ছিলেন। বিলাল রা. এবং উসামা ইবনে যায়েদ রা. তাঁর সাথে ছিলেন। একজন তাঁর উটের লাগাম ধরেছিলেন এবং অন্যজন একটি কাপড় দিয়ে রাসূল ﷺ কে তাপ থেকে ছায়া দিচ্ছিলেন।৫৭ রাসূল ﷺ কংকর নিক্ষেপের পূর্বে তালবিয়া উচ্চারণ করা বন্ধ করেন। অতঃপর সূর্য পূর্ণ আলোকিত হওয়ার৫৮ পর বড় জামরাতে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করেন। তিনি উপত্যকার মধ্যভাগ থেকে কংকর নিক্ষেপ করেন। প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলেন। কংকরগুলো ছিল বুটের ন্যায়।৫৯

লোকেরা ভিড় করতে থাকে এবং নবী ﷺ বলেন, ‘হে লোকেরা, একে অপরকে হত্যা করো না। যখন তোমরা জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করো, তখন ছোট কংকর নিক্ষেপ করো।৬০

যখন তিনি কংকর নিক্ষেপ করছিলেন, তখন লোকেরা তাঁর চারপাশে ভিড় করে, যদিও তাদের এমন করার জন্য তিরস্কার করা হয়নি। কুদামা ইবনে আবদুল্লাহ রা. বর্ণনা করেন: আল্লাহর রাসূল কুরবানীর দিন উপত্যকার মাঝখান থেকে তাঁর মালিকানাধীন একটি লালচে রঙের উটের উপর চড়ে আকাবার স্তূপে কংকর নিক্ষেপ করেন এবং সেখানে কোনো আঘাত করা, ধাক্কা দেওয়া ‘দূরে থাকো! দূরে থাকো!’ বলা ছিল না।৬১

৪.১জামরাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপ৩০ সেকেন্ডের কম

১০ই জিলহজ ‘ইয়াউমুন নহর’ বা ‘কুরবানির দিন’। রাসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচেয়ে বড় দিন হল কুরবানির দিন, তারপর ১১ তারিখের দিন। রাসূল ﷺ কুরবানির দিন বলেন, এটা কোন দিন? সাহাবিরা বলল, কুরবানির দিন। তিনি বললেন, এটা বড় হজের দিন।৫৬

কেননা এই দিনে হজের চারটি মৌলিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। কাজগুলো হলো, ১. বড় জামরায় কংকর নিক্ষেপ করা, ২. কুরবানি করা, ৩. হলক বা কছর করা, ৪. বায়তুল্লাহর ফরজ তাওয়াফ করা।

৪. ইয়াউমুন নহর- ১০ই জিলহজ~১৩ মিনিট
জামরাতুল আকাবা, ১৯৬৫ সাল

কংকর নিক্ষেপ শেষে রাসূল ﷺ সাহাবিদের উদ্দেশ্যে খুতবা প্রদান করেন। আল্লাহর প্রশংসা করার পর রাসূলﷺ বলেন, “হে লোকসকল! তোমরা আমার নিকট থেকে হজ ও কুরবানীর নিয়ম-কানূন শিখে নাও। হয়তো বা এ বছরের পর আমার পক্ষে আর হজ করা সম্ভব হবে না’। সময় ও কাল আবর্তিত হয় নিজ চক্রে। যেদিন থেকে আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এক বছর হয় বার মাসে। এর মধ্যে চার মাস সম্মানিত। তিনমাস ক্রমান্বয়ে আসে-যেমন জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম এবং ৪র্থ মাস মুযার গোত্রের রজব মাস, যা জমাদিউল উখরা ও শাবান মাসের মাঝে থাকে।

তোমরা কি জান আজ কোন দিন? তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলﷺ সব চেয়ে বেশি জানেন। রাসূল ﷺ নীরব হয়ে গেলেন। সাহাবিরা ধারণা করল সম্ভবত রাসূলﷺ এর নাম পাল্টিয়ে অন্য নামে নামকরণ করবেন। তিনি বললেন, এটা কি কুরবানীর দিন নয়? তারা বলল, হাঁ। তিনি বললেন, এটি কোন মাস? তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলﷺ ই সবচেয়ে বেশি জানেন। রাসূলﷺ নীরব হয়ে গেলেন। তারা মনে করতে লাগল, হয়ত রাসূল ﷺ এর নাম পাল্টিয়ে অন্য কোন নামে নামকরণ করবেন। রাসূলﷺ বললেন, এ কি জিলহজ মাস নয়? তারা বলল, হাঁ। অতঃপর তিনি বললেন, এটি কোন শহর? তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ ই সবচেয়ে বেশি জানেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ নীরব হয়ে গেলেন। ফলে তারা ভাবতে লাগল, হয়ত তিনি এর নাম বদলিয়ে অন্য নামকরণ করবেন। তিনি বললেন, এ কি সম্মানিত শহর নয়? আমরা বললাম, নিশ্চয়ই। রাসূলﷺ বললেন, তোমাদের জীবন, সম্পদ ও সম্মান তোমাদের জন্য পবিত্র, যেমন তোমাদের এ মাস, এ শহর, এ দিন পবিত্র।

হে লোকসকল! শুনে রাখ আমার পরে কোন নবী নেই এবং তোমাদের পরে কোন উম্মত নেই। অতএব তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত কর। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় কর। রামাযান মাসের সিয়াম পালন কর। সন্তুষ্ট চিত্তে মালের যাকাত দাও। তোমাদের শাসকদের আনুগত্য কর। তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ কর’। ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় কর। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় কর। রামাযান মাসের ছিয়াম পালন কর। তোমাদের মালের যাকাত দাও। তোমাদের আমীরের আনুগত্য কর। তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ কর’।

তোমরা শীঘ্রই তোমাদের রবের সঙ্গে মিলিত হবে। তখন তিনি তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। সতর্ক থেকো, তোমরা আমার পরে পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করে কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করো না। আজকের এ দিনের মত, এ শহরের মত এবং এ মাসের মতো আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের রক্তকে ও তোমাদের সম্পদকে তোমাদের উপর হারাম করেছেন। বল তো, আমি কি আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি। সমবেত সকলে বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। এ কথা তিনবার বললেন। অতঃপর তিনি বললেন, প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে (আমার দাওয়াত) পৌঁছিয়ে দেয়। কেননা, যাদের কাছে পৌঁছানো হবে তাদের মধ্যে অনেক ব্যক্তি এমন থাকে যে, শ্রবণকারীর চেয়ে অধিক সংরক্ষণকারী।”৬২

৪.২কুরবানির দিন মিনায় খুতবা~১ মিনিট

একজন সাহাবি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাদের কাছে কী চান?” রাসূলﷺ উত্তর দেন: তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর, তোমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় কর। তোমাদের রামাযান মাসের রোযা রাখ, তোমাদের ধন-দৌলতের যাকাত আদায় কর এবং তোমাদের আমীরের অনুসরণ কর, তবেই তোমাদের রবের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।৬৩

কিছু বেদুইন রাসূলﷺ কাছে আসেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক অমুক ব্যাপারে আমাদের কোন দোষ হবে কি? তারা এমন কিছু মানবীয় বিষয় জিজ্ঞেস করে যাতে দোষের কিছু ছিলো না। তিনি বলেন, “হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ পাপকে রহিত করেছেন। পাপ তো এমন লোকের হতে পারে যে নিজের জন্য অত্যাচার-নির্যাতনকে অবধারিত করে নিয়েছে। এতে তার পাপ হয় এবং সে ধ্বংস হয়”। “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো? তিনি বলেন, তোমরা চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করো; কেননা মহান আল্লাহ একমাত্র বার্ধক্য ছাড়া সকল রোগেরই ঔষধ সৃষ্টি করেছেন। তারা আরও জিজ্ঞাসা করে: “মানুষকে দেওয়া সবচেয়ে ভালো জিনিস কী?” রাসূলﷺ উত্তর দেন: “ভালো নৈতিকতা।”৬৪

৪.৩প্রশ্নের উত্তর প্রদান৩০ সেকেন্ডের কম
৪.৪তাঁবু স্থাপনের স্থান~২ মিনিট

রাসূলﷺ তারপর মিনায় তাঁবুতে ফিরে যান। তাঁবুর অবস্থান ছিল বর্তমানে যেখানে ‘মসজিদে খায়ফ’ অবস্থিত সেখানে।

তিনি কিবলাহর ডান দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এখানে মুহাজিরগণ অবস্থান করবে এবং কিবালাহর বাম দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এখানে আনসারগণ অবস্থান করবে।

আর অন্যান্য লোক তাদের আশেপাশে অবস্থান করবে।৬৫

১৯০৭ সালে মসজিদে খায়ফ

অতঃপর রাসূল ﷺ হাদীর উদ্দেশ্যে কুরবানির স্থানে যান। কুরবানির স্থানটি মিনার যেখানে রাসূল ﷺ অবস্থান করছিলেন, তার কাছাকাছি ছিল। মসজিদে খায়ফের আধুনিক সম্প্রসারণের সাথে এই কোরবানির স্থানটি এখন মসজিদের সীমানার মধ্যে অবস্থিত, যদিও এটি আর আগের মতো চিহ্নিত করা নেই।

হযরত আলী রা. ইয়েমেন থেকে যে কুরবানির পশুগুলো নিয়ে এসেছিলেন এবং রাসূলﷺ মদিনা থেকে যে পশুগুলো নিয়ে এসেছিলেন, তার মোট সংখ্যা ছিল একশো। রাসূলﷺ কুরবানির স্থানে যান এবং তাঁর নিজের হাতে ৬৩টি উট কোরবানি করেন। অতপর হযরত আলী রা. কে অবশিষ্টগুলো যবেহ করার দায়িত্ব দেন এবং তাকে নিজের হাদীতে শরীক রাখেন।৬৬

অতপর আল্লাহর রাসূলﷺ বললেন, ‘আমি এখানে যবেহ করলাম, আর মিনা পুরোটাই যবেহের স্থান। মক্কার প্রতিটি অলিগলি, চলার পথ যবেহের স্থান। অতএব, তোমরা তোমাদের অবস্থানস্থলে পশুসমূহ থেকে যবেহ কর।৬৭

রাসূলﷺ আলী রা. কে উট জবাই তত্ত্বাবধান করতে এবং তার গোশত, চামড়া এবং চামড়ার বাইরের অংশ দান করতে এবং জবাইয়ের মজুরি হিসেবে কসাইকে কিছু না দিতে নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘আমরা তাকে নিজেরাই পরিশোধ করব।৬৮

রাসূল ﷺ প্রত্যেক উট থেকে এক টুকরো করে নিয়ে রান্না করতে নির্দেশ দেন৷ টুকরোগুলো এক পাতিলে রেখে রান্না করা হয়। অতঃপর দুজনে এর থেকে গোশত খান ও ঝোল পান করেন৷৬৯

রাসূল ﷺ তার স্ত্রীদের পক্ষ থেকে একটি গাভি যবেহ করেন।

হযরত আয়িশা রা. বলেন, কুরবানির দিন আমাদের কাছে গরুর গোশত আনা হলে আমি বললাম, এ কী? তারা বলল, আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে কুরবানি করেছেন।৭০

রাসূলﷺ সাত জনের পক্ষ হতে একটি উট যবেহ করেছেন। আর সাতজনের পক্ষ হতে একটি গাভি যবেহ করেছেন। সাহাবিদের সাতজনের প্রতিটি দল তাদের মধ্যে একটি উট বা গরু কোরবানি করে।৭১

৪.৫পশু কুরবানি~২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

একজন লোক রাসূল ﷺ কে বললেন, আপনি কি মনে করেন, গাভিতেও শরীক হওয়া যাবে? তখন তিনি বললেন, গাভিতো উটের (বিধানের) অন্তর্ভুক্ত।৭২ সাহাবিরা মিনায় তিনদিন উটের গোশত খেয়ে বিরত রইল। অতপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদেরকে খাওয়ার অনুমতি দিয়ে বললেন, তোমরা খাও এবং পাথেয় হিসেবে রেখে দাও। হযরত জাবির রা. বলেন, অতঃপর আমরা খেলাম এবং জমা করে রাখলাম। এমনকি এগুলো নিয়ে আমরা মদিনায় পৌঁছলাম।৭৩

মুশরিকরা তাদের যবেহকৃত হাদীর গোশত ভক্ষণ করত না। তা তারা নিজেদের জন্য হারাম মনে করত। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তা খাওয়ার আদেশ দেয়ার মাধ্যমে জাহেলী কুপ্রথার বিলুপ্তি ঘটান।

কুরবানির পশুমিনা , ১৯৫৩ সাল

এরপর রাসূল ﷺ তাঁর তাঁবুতে যান এবং হযরত মা’মার ইবনে আবদুল্লাহ আদভী রা. কে ডাকেন, যিনি তাঁর বরকতময় মাথার ডান দিক থেকে চুল মুণ্ডন করেন। রাসূলﷺ আবু তালহা আনসারী রা. কে ডাকেন এবং তাঁকে চুল দেন। মা’মার রা. তারপর তাঁর মাথার বাম দিক থেকে চুল মুণ্ডন করেন এবং রাসূল ﷺ আবার তা আবু তালহাকে দেন, তাঁকে লোকদের মধ্যে বিতরণ করতে নির্দেশ দেন।৭৪

হযরত আনাস রা. বলেন, আমি দেখেছি নাপিত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চুল ছাটছে আর সাহাবিরা তার চারপাশ ঘিরে রেখেছেন। তারা চাইতেন যে, কোন চুল যেন মাটিতে না পড়ে, তা যেন কারো না কারো হাতে পড়ে।

ইমাম মুহাম্মদ আলযারকানী আল-মালিকী রহ. নবী করিম ﷺ- এর চুল মোবারক বিতরণের পেছনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, নবী করিম ﷺ তাঁর পবিত্র চুল সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বিতরণ করেছিলেন, যাতে তাঁদের মধ্যে বরকত অবশিষ্ট থাকে এবং তা তাঁর স্মরণকে জীবন্ত রাখার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। এ কাজের মাধ্যমে নবী করিম ﷺ তাঁর আসন্ন ইন্তেকালের দিকেও ইশারা করেছিলেন।৭৫

কিছু সাহাবি তাঁদের চুল ছোট করে কাটেন, আবার কেউ কেউ তাঁদের মাথা সম্পূর্ণরূপে মুণ্ডন করেন। যাঁরা তাঁদের মাথা মুণ্ডন করেছিলেন, রাসূলﷺ তাঁদের জন্য তিনবার দু’আ করেন এবং যাঁরা তাঁদের চুল ছোট করেছিল, তাদের জন্য একবার দুআ করেন ।

আল্লাহর রাসূলﷺ বলেন, ‘হে আল্লাহ! যাঁরা তাঁদের মাথা মুণ্ডন করেছেন, তাঁদেরকে ক্ষমা করুন।’ সাহাবিগণ বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! চুল খাটোকারীদের জন্য দু’আ করুন।’ রাসূলﷺ বলেন, ‘হে আল্লাহ! যাঁরা তাঁদের মাথা মুণ্ডন করেছেন, তাঁদেরকে ক্ষমা করুন।’ সাহাবিগণ বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এবং চুল খাটোকারীদের জন্য দু’আ করুন। রাসূল ﷺ তৃতীয়বারের মতো মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য দু’আ করেন। সাহাবিগণ আবেদন করেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! চুল খাটোকারীদের জন্য দু’আ করুন।’ রাসূল ﷺ তারপর একবার চুল খাটোকারীদের জন্য দু’আ করেন।৭৬

৪.৬মাথা মুণ্ডন করা৩০ সেকেন্ডের কম

মাথা মুণ্ডন করাচ্ছেন একজন হজযাত্রী

মাথা মুণ্ডন করার পর, রাসূল ﷺ ইহরামের পোশাক পরিবর্তন করে সাধারণ পোশাক পরেন। তারপর হযরত আয়িশা রা. তাঁর মাথায় কস্তুরীর সুগন্ধি মাখিয়ে দেন।৭৭

৪.৭ইহরাম থেকে হালাল হওয়া~৪৫ সেকেন্ড

হযরত আবূ তুফায়ল রা. বলেন, অতপর রাসূল ﷺ তাঁর উটের উপর চড়ে হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. কে তাঁর পিছনে বসিয়ে তাওয়াফে ইফাযা (ফরজ তাওয়াফ) করার জন্য মক্কার দিকে যাত্রা করেন। কাবার কাছে পৌঁছানোর পর তিনি উটের উপর চড়ে তাওয়াফ করেন এবং সাফা-মারওয়া সাঈ করেন, যাতে সবাই তাঁকে দেখতে পারেন এবং তাঁর কাছ থেকে হজের বিধি-বিধান শিখতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন। লোকেরা চতুর্দিক থেকে তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। তিনি লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদে স্পর্শ করেন এবং লাঠিতে চুমু খান।৭৮

আমি রাসূল ﷺ কে বায়তুল্লাহ তওয়াফ করতে, তার সাথের লাঠি দিয়ে রুকন স্পর্শ করতে এবং লাঠিতে চুম্বন করতে দেখেছি।৭৯

এই তাওয়াফের সময় তিনি রমল/ইযতিবা করেননি।৮০

৪.৮তাওয়াফে ইফাযা~১ মিনিট
বায়তুল্লাহ, ১৯২২ সাল

রাসূলﷺ এর চাচা হযরত আব্বাস রা. ছিলেন সিকায়ার তত্ত্বাবধায়ক, যিনি হজযাত্রীদের পানি সরবরাহ করতেন।

আল্লাহর রাসূলﷺ পানি পান করার স্থানে এসে তার চাচার নিকট পানি চাইলেন। ‘হযরত আব্বাস রা. বললেন, হে ফযল! তোমার মার নিকট যাও। আল্লাহর রাসূলﷺ এর জন্য তার নিকট হতে পানীয় নিয়ে এসো। রাসূল ﷺ বললেনঃ এখান হতেই পান করান। ‘আব্বাস রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! লোকেরা এই পানিতে হাত রাখে। আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, এখান হতেই দিন এবং এই পানি হতেই পান করলেন।৮১

এরপর যমযম কূপের নিকট এলেন। আব্দুল মুত্তালিব গোত্রের সন্তানেরা হাজীদেরকে যমযমের পানি পান করাচ্ছিল। তিনি বললেন, তোমরা কাজ করে যাও। তোমরা নেক কাজে রত আছ। যদি আমার ভয় না থাকত যে, অন্যান্য লোকেরা তোমাদের সাথে (যমযম থেকে পানি তোলার ক্ষেত্রে) প্রতিযোগিতা করবে, তবে আমি নিজেই নেমে (বালতির) রশি এখানে নিতাম; এ বলে তিনি আপন কাঁধের প্রতি ইঙ্গিত করেন।৮২

অতপর তারা তাঁকে বালতি ভরে পানি দিলেন, আর তিনি তা পান করলেন। রাসূলﷺ দাঁড়ানো অবস্থায় যমযমের পানি পান করেছেন।৮৩

রাসূলﷺ বলেন, আমাদের এবং মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য হলো তারা যমযম পেট ভরে পান করে না।৮৪

৪.৯যমযমের পানি পান~৪৫ সেকেন্ড

একসময় যমযমের কূপের একটি প্রবেশপথ ছিল

বালতি দিয়ে যমযম কূপ থেকে পানি তুলছেন

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বর্ণনা করেন যে, তিনি মিনায় ফিরে আসার আগে মক্কায় সালাত আদায় করেন।৮৫ অন্যদিকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলﷺ কুরবানীর দিন তাওয়াফুল ইফাযাহ সম্পন্ন করেন, অতঃপর মিনায় ফিরে এসে যুহরের সালাত আদায় করেন। নাফি’ রহ. বলেন, ইবনু উমর রা.-ও কুরবানীর দিন তাওয়াফুল ইফাযাহ সম্পন্ন করতেন, অতঃপর ফিরে এসে মিনায় যোহরের সালাত আদায় করতেন এবং বলতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করেছেন।৮৬

সম্ভবত রাসূল ﷺ মক্কায় যোহরের সালাত আদায় করেন, তারপর মিনায় ফিরে আসেন, সেখানে তিনি সাহাবিদের তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে দেখেন এবং তাদের সাথে আবার যোহরের সালাত আদায় করেন। আল্লাহ ভালো জানেন।

৪.১০যোহরের সালাত আদায়~৪৫ সেকেন্ড

রাসূলﷺ কুরবানীর দিন মিনাতে সাহাবিদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন৷ সে দিনের আমলগুলোতে ‘আগে পরে হয়েছে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, ‘কোন সমস্যা নেই, কোন সমস্যা নেই’।

এক ব্যক্তি এসে বললেন, আমি যবেহ করার পূর্বে মাথা মুণ্ডন করে ফেলেছি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই।’

অন্য একজন এসে বললেন, ‘আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে মাথা মুণ্ডন করেছি, রাসূলুল্লাহﷺ বললেন, ‘কোন সমস্যা নেই।’

‘আরেক জন বললেন, আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে তাওয়াফ করেছি, তিনি বললেন, ‘কোন সমস্যা নেই।

অন্য আরেক ব্যক্তি এসে বলল, আমি পশু যবেহের আগে তাওয়াফ করেছি। তিনি বললেন, যবেহ কর। ‘কোন সমস্যা নেই।’

অন্য আরেক ব্যক্তি এসে বললেন, ‘আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে পশু যবেহ করেছি। তিনি বললেন, ‘নিক্ষেপ কর। কোন সমস্যা নেই।’৮৭

৪.১১মিনায় প্রত্যাবর্তন~১ মিনিট
১৯৫৩ সালে মিনা

রাসূলﷺ তিন দিন মিনায় অবস্থান করেন। সেখানে সোমবার, মঙ্গলবার এবং বুধবার কাটান। রাসূল ﷺ আরাফাতে মিনায় অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, মিনার জন্য নির্ধারিত আছে তিন দিন। কোন ব্যক্তি যদি দুই দিনে চলে যেতে তাড়াহুড়ো করে, তার কোনো গুনাহ নেই এবং কোন ব্যক্তি যদি থেকে যায়, তারও কোনো গুনাহ নেই।৮৮

রাসূল ﷺ তাঁর বেশ কয়েকজন সাহাবিকে, যার মধ্যে আলী ইবনে আবি তালিব, আবু হুরায়রা, ইবনে উমর, বিশর ইবনে সুহাইম, কা’ব ইবনে মালিক, আওস, আবদুল্লাহ ইবনে হুদাফা এবং সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. অন্তর্ভুক্ত, মিনার শিবিরগুলোর মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে এবং লোকদের কাছে নিম্নলিখিত বার্তাটি ঘোষণা করতে পাঠান, “একমাত্র বিশ্বাসী ব্যক্তি ছাড়া, অন্য কাউকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে না। মিনার দিনগুলো খাওয়া, পান করা এবং আল্লাহর মহিমা ঘোষণার দিন। এই দিনগুলোতে রোজা রাখা অনুমোদিত নয়।”৮৯

মিনায় হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা. বলতে লাগলেনঃ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে, এই দিনগুলো (১০-১৩ই জিলহজ) পানাহারের দিন। এ দিনগুলোতে তোমাদের কেউ যেন রোযা না রাখে। অতঃপর তিনি তাঁর উটে চড়ে এই ঘোষণা দিতে দিতে জনগণের অনুসরণ করতে লাগলেন।৯০

৫. আইয়ামুত তাশরীক – ১১ থেকে ১৩ই জিলহজ~৭ মিনিট

রাসূলﷺ মসজিদে খায়ফে সালাত আদায় করেন, যা তাঁর তাঁবুর কাছে ছিল। চার রাকাতের প্রতিটি সালাতকে দুই রাকাতে সংক্ষিপ্ত করে আদায় করেন।

মসজিদে খায়ফ সম্পর্কে তিনি বলেন, “সত্তরজন নবী মসজিদে খায়ফে সালাত আদায় করেছেন।”৯১

সেই সময়ে মসজিদে খায়ফ একটি খোলা জায়গা ছিল এবং এর কোনো দেয়াল ছিল না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন: আমি একটি মাদি গাধার উপর চড়ে আসি এবং সেই সময়ে আমি সবেমাত্র বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছেছিলাম। রাসূলﷺ মিনায় লোকদের সালাতে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁর সামনে কোনো দেয়াল ছিল না এবং তারা যখন সালাত আদায় করছিল, তখন আমি কিছু কাতারের সামনে দিয়ে যাই। সেখানে আমি গাধাটিকে ঘাস খেতে দিই এবং আমি কাতারে প্রবেশ করি, কেউ আপত্তি করেনি।৯২

ফজরের সালাতে রাসূল ﷺ দুইজন লোককে দেখেন, যারা জামাতে যোগ দেয়নি। হযরত ইয়াজিদ ইবনে আসওয়াদ রা. বলেন আমি রাসূল ﷺ এর সাথে হজে অংশ নিই। আমি তাঁর সাথে মসজিদে খায়ফে ফজরের সালাত আদায় করি। রাসূলﷺ যখন সালাত শেষ করেন, তখন তিনি (কিবলা থেকে) ফিরে দেখেন যে, দুইজন লোক লোকদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, যারা তাঁর সাথে সালাত আদায় করেনি। তিনি বলেন, ‘তাদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ তাই আমি তাদেরকে তাঁর কাছে নিয়ে আসি, তখন তারা ভয়ে কাঁপছিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের সাথে সালাত আদায় করতে তোমাদের কিসে বাধা দিয়েছে?’ তারা বলে: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের তাঁবুতে সালাত আদায় করেছি।’ তিনি বলেন, ‘এমন করো না। যদি তোমরা তোমাদের তাঁবুতে সালাত আদায় করো, তারপর এমন মসজিদে আসো, যেখানে জামাত হয়, তাদের সাথে সালাত আদায় করো। এটি তোমাদের জন্য নফল সালাত হিসেবে গণ্য হবে।’৯৩

তিনি আরও বলেন, লোকেরা রাসূলﷺ এর কাছে আসে এবং আমি তাদের সাথে যাই। আমি সেই সময়ে খুব শক্তিশালী ছিলাম এবং আমি ভিড়ের মধ্য দিয়ে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকি, যতক্ষণ না আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে পৌঁছাই। আমি তাঁর হাত ধরি এবং আমার মুখ বা বুকের উপর রাখি। আমি রাসূল ﷺ এর হাতের চেয়ে শীতল বা ভালো কিছু অনুভব করিনি।৯৪

৫.১সালাত আদায়~৬০ সেকেন্ড

১৯০৮ সালে মিনার মসজিদে খায়ফ

মধ্যাহ্নে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পরলে, রাসূলﷺ কংকর নিক্ষেপের জন্য জামারাতের দিকে যান।৯৫

তিনি প্রথম জামরা, জামরাতুল উলাতে সাতটি কংকর নিক্ষেপের করেন এবং প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সময় তাকবীর (আল্লাহু আকবার) বলেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে উভয় হাত তুলে দীর্ঘক্ষণ দুআ করেন।৯৬

তারপর দ্বিতীয় জামরা, জামরাতুল উস্তাতে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করেন এবং একটু বা দিকে চলে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে উভয় হাত তুলে দীর্ঘক্ষণ দুআ করেন।৯৭

রাসূলﷺ প্রথম জামরাতের চেয়ে দ্বিতীয় জামরাতের কংকর নিক্ষেপের পর বেশি সময় ধরে দু’আ করেন।৯৮

অতঃপর তৃতীয় জামরা, জামরাতুল আকাবাতে বাতনে ওয়াদী হতে কংকর নিক্ষেপের পর সেখানে দু’আ না করে ফিরে আসেন।৯৯

তাশরীকের দিনগুলোতে রাসূল ﷺ কংকর নিক্ষেপের সময় হেঁটে যেতেন এবং ফিরে আসতেন।১০০

রাসূল ﷺ ১৩ই জিলহজ পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করেন এবং তাশরীকের বাকি দিনগুলোতে একইভাবে জামরাসমূহে কংকর নিক্ষেপ করেন।

৫.২জামরাতে কংকর নিক্ষেপ- ১১, ১২, ১৩ই জিলহজ~১ মিনিট
জামরাহ সমূহের পুরাতন ছবি

তাশরীকের দিনগুলোতে মক্কায় থাকার জন্য কিছু সাহাবিকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। রাসূলﷺ এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের মধ্যে একজন ছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. আল্লাহর রাসূলﷺ এর কাছে তাশরীকের দিনগুলোতে মক্কায় থাকার অনুমতি চান, যাতে তিনি হজযাত্রীদের পান করার জন্য পানি সরবরাহ করতে পারেন। রাসূল ﷺ তাঁকে অনুমতি দেন।১০১

একইভাবে রাখালদের তাশরীকের দিনগুলোর মধ্যে একদিন তাদের গবাদি পশুর দেখাশোনার জন্য মিনা থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা যেন তাশরীকের শেষ দিনে দুই দিনের কংকর নিক্ষেপ আদায় করে।

আবুল-বাদ্দাহ ইবনে আসিম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ কিছু উট পালনকারীকে ছাড় দেন, তাদের একদিনের জন্য মিনা থেকে যাওয়ার অনুমতি দেন। তিনি তাদের ইয়াওমুন নাহরের দিনে জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করার অনুমতি দেন, তারপর কুরবানির পরে দুই দিনের কংকর নিক্ষেপ একত্রিত করার অনুমতি দেন, যাতে তারা দুই দিনের মধ্যে একদিনে তা করতে পারে।১০২

৫.৩ছাড়সমূহ~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

আইয়ামে তাশরীকের ১ম দিনের ভাষণ:

রাসূলﷺ জামরায় কংকর নিক্ষেপের পর ফিরে এসে জাদ‘আ উটনীর উপর বসা অবস্থায় বলেন, ‘যদি তোমাদের উপর নাক-কান কাটা কৃষ্ণকায় গোলামও আমীর নিযুক্ত হন, যিনি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী পরিচালিত করেন, তোমরা তাঁর কথা শোন ও মান্য কর’।১০৩

আইয়ামে তাশরীকের ২য় দিনের ভাষণ:

রাসূলﷺ আমাদেরকে আইয়ামে তাশরীকের মধ্যবর্তী দিনে (১২ তারিখ) সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভাষণ দিয়ে বলেন, ‘হে জনগণ! নিশ্চয় তোমাদের পালনকর্তা মাত্র একজন। তোমাদের পিতাও মাত্র একজন। মনে রেখ! আরবের জন্য অনারবের উপর, অনারবের জন্য আরবের উপর, লালের জন্য কালোর উপর এবং কালোর জন্য লালের উপর কোনরূপ প্রাধান্য নেই আল্লাহভীরুতা ব্যতীত’। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহভীরু। তিনি বলেন, আমি কি তোমাদের নিকট পৌঁছে দিলাম? লোকেরা বলল, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, অতএব উপস্থিতগণ যেন অনুপস্থিতদের নিকট পৌঁছে দেয়’।১০৪

এদিন রাসূল ﷺ হামদ ও ছানার পর ‘দাজ্জাল’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। অতঃপর বলেন, ‘আল্লাহ এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি, যিনি তার উম্মতকে এ বিষয়ে সতর্ক করেননি। নূহ এবং তাঁর পরবর্তী নবীগণ তাদের স্ব স্ব উম্মতকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সে তোমাদের মধ্যে বহির্গত হবে। তার অবস্থা তোমাদের নিকট গোপন থাকবে না। তার ডান চোখ হবে কানা, ফোলা আঙ্গুরের মত’। অতঃপর তিনি বলেন, তোমরা সাবধান থেকো। আমার পরে তোমরা একে অপরের গর্দান মেরে যেন পুনরায় কাফের হয়ে যেয়ো না’।১০৫

‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বস্তু রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা তা মযবুতভাবে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ’।১০৬

৫.৪তাশরীকের দিনগুলোতে প্রদত্ত ভাষণ~৪৫ সেকেন্ড

মিনায় থাকাকালীন রাসূলﷺ এর উপর সূরা আন-নাসর অবতীর্ণ হয়। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন: এই সূরাটি বিদায় হজের সময় তাশরীকের মধ্যবর্তী দিনে মিনায় রাসূল ﷺ এর উপর অবতীর্ণ হয় এবং এর মাধ্যমে তিনি তাঁর আসন্ন প্রস্থান সম্পর্কে অবগত হন। রাসূলﷺ তাঁর বাহন কাসওয়াকে ডাকেন এবং তাতে আরোহণ করেন। তারপর তিনি আকাবায় থামেন এবং একটি খুতবা দেন। সেখানে কতজন মুসলিম উপস্থিত ছিলেন, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।১০৭

হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ রা. কে হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘তুমি কি জানো কুরআনে সম্পূর্ণভাবে অবতীর্ণ হওয়া শেষ সূরা কোনটি?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, (যে সূরাটি শুরু হয়) যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসে।’ তখন তিনি বলেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’১০৮

৫.৫সূরা আন-নাসর অবতীর্ণ হওয়া~৪৫ সেকেন্ড

১২ই জিলহজ হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. রাসূল ﷺ কে জিজ্ঞেস করেন, আগামীকাল আমরা কোথায় অবতরণ করবো? তিনি বললেন, আমরা আগামীকাল বনু কিনানার ঘাঁটিতে (মুহাসসাবে) অবতরণ করব্‌ যেখানে কুরায়শগণ কুফুরীর উপর অবিচল থাকার শপথ করেছিল।১০৯ আবু হুরায়রা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ (মিনা হতে ফিরে) যখন মক্কা প্রবেশের ইচ্ছা করলেন তখন বললেন, আগামীকাল খায়ফ বনী কেনানায় (মুহাসসাবে) ইনশাআল্লাহ আমাদের অবস্থানস্থল হবে, যেখানে তারা (বনূ খায়ফ ও কুরাইশরা) কুফরীর উপর শপথ করেছিল।১১০

এই স্থানে বনু কিনানাহ কুরাইশদের সাথে বনু হাশিম এবং বনু মুত্তালিবের বিরুদ্ধে একটি চুক্তি করেছিল যে, তারা তাদের সাথে বিবাহ করবে না বা তাদের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন করবে না, যতক্ষণ না তারা রাসূল ﷺ কে তাদের হাতে তুলে দেয়।

৫.৬ই জিলহজ৩০ সেকেন্ডের কম
৬. মক্কা ত্যাগ~৫ মিনিট

রাসূল ﷺ ১৩ই জিলহজ মঙ্গলবার পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করেন এবং শেষবারের মতো রামি আদায় করার পর মিনা থেকে মক্কায় ফেরার পথে ‘মুহাসসাবে’ অবস্থান করেন, যা মিনা এবং মক্কার মধ্যে অবস্থিত একটি উপত্যকা।

মক্কা, ১৯৫৩ সালমক্কা, ১৮৮৭ সাল

রাসূল ﷺ ১৩ই জিলহজ মিনা থেকে মক্কায় ফেরার পথে ‘মুহাসসাবে’ অবস্থান করেন, যা মিনা এবং মক্কার মধ্যে অবস্থিত একটি উপত্যকা। যা ‘আবতাহ/ বাতহা বা খায়ফ বনি কিনানাহ’ নামেও পরিচিত। এটি সেই একই স্থান, যেখানে তিনি উমরাহ সম্পন্ন করার পর ৪ই জিলহজ থেকে ৮ই জিলহজ অবস্থান করেছিলেন৷

মুহাসসাব উপত্যকায় তিনি যোহর, আসর, মাগরিব ও এশার সালাত আদায় করেন এবং কাবায় গিয়ে তাওয়াফ করার আগে রাতের কিছু অংশে বিশ্রাম নেন।১১১

বর্তমানে এই জায়গায় একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদের নাম ‘মসজিদুল ইজাবা’।

হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. সহ কিছু সাহাবির অভ্যাস ছিল মিনা থেকে প্রস্থান করার পর মুহাসসাবে অবতরণ করতেন, সেখানে তারা সালাত আদায় করতেন এবং কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতেন, যেমনটি রাসূলﷺ করেছিলেন।১১২

রাসূলﷺ এই জায়গায় তাঁবু স্থাপন করতে পছন্দ করতেন। তিনি মক্কা বিজয়ের পর এই জায়গাতেই অবস্থান করেছিলেন।

আবতাহ/বাতহা/ মুহাসসাব/খাইফ বনি কিনানা

৬.১মিনা থেকে প্রস্থান এবং মুহাসসাবে অবস্থান~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়িশা রা. এই কারণে অসন্তুষ্ট ছিলেন যে তিনি ঋতুস্রাবের কারণে উমরাহ আদায় করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমার ঋতুস্রাব হয় এবং আমি কাবার চারপাশে তাওয়াফ করতে পারিনি। তাই যখন হাসবার রাত ছিল (অর্থাৎ যখন আমরা মুহাসসাবে থেমেছিলাম), তখন আমি বলি, ‘হে আল্লাহর রাসূল! সবাই হজ ও উমরাহ আদায় করে ফিরে আসছে কিন্তু আমি শুধু হজ আদায় করে ফিরে আসছি।

তিনি বলেন, ‘আমরা মক্কায় পৌঁছানোর রাতে তুমি কি কাবার চারপাশে তাওয়াফ করনি?’ আমি না বোধক উত্তর দিই। তিনি বলেন, ‘তোমার ভাইয়ের সাথে তানঈমে যাও এবং উমরাহর জন্য ইহরাম বাঁধো।’১১৩

রাসূলﷺ তাঁর ভাই আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা. কে ডেকে বলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে হারামের বাইরে নিয়ে যাও এবং সেখান থেকে যেন সে ইহরাম বাঁধে। অতঃপর তাওয়াফ করে নিবে। আমি তোমাদের জন্য এখানে অপেক্ষা করবো।১১৪

আমি আবদুর রহমানের উটের উপর তাঁর পিছনে চড়ে বসি। আমার মনে আছে, যেহেতু আমি অল্পবয়সী ছিলাম, তাই আমার ঘুম পেত এবং আমার মাথা পড়ে যেত এবং আমার মুখ জিনের পিছনে স্পর্শ করত। এটি খুব গরম রাত ছিল, এতটাই যে আমার মাথার আবরণ আমার ঘাড় থেকে পড়ে যেত। আমার ভাই আমার পা ধরে উটের সাথে আঘাত করত। আমরা তানঈমে পৌঁছাই, যেখানে আমি মক্কায় প্রবেশের পর লোকেরা যে উমরাহ আদায় করেছিল, তার পরিবর্তে উমরাহ শুরু করি।১১৫

আমরা মধ্যরাতে ফিরে আসি এবং রাসূলﷺ আমাদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা কি তাওয়াফ শেষ করেছ?’ আমি হ্যাঁ বোধক উত্তর দিই।১১৬

৬.২আয়িশা রা. এর উমরাহ আদায়~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

মসজিদে আয়িশা রা. , ১৯০৮ সাল

মধ্যরাতে হযরত আয়িশা রা. মুহাসসাবের তাঁবুতে ফিরে আসার পর, রাসূলﷺ সাহাবিদের ফজরের আগে বিদায়ী তাওয়াফ আদায় করার জন্য মক্কায় যেতে নির্দেশ দেন।

রাসূল ﷺ মসজিদুল হারামে ফজরের সালাত আদায় করেন। সালাতে তিনি সূরা আত-তুর তিলাওয়াত করেন।

রাসূলﷺ এর স্ত্রীদের মধ্যে একজন, হযরত উম্মে সালামা রা. অসুস্থতার কারণে বাহনের উপর তাওয়াফ করেন। তিনি বর্ণনা করেন: আমি আল্লাহর রাসূলﷺ কে জানাই যে আমি অসুস্থ। তিনি বলেন, ‘লোকদের পিছনে বাহনে চড়ে তাওয়াফ করো।’ তাই আমি লোকদের পিছনে বাহনে চড়ে তাওয়াফ করছিলাম, তখন আল্লাহর রাসূল ﷺ কাবার পাশে সালাত আদায় করছিলেন এবং তিনি সূরা আত-তুর তিলাওয়াত করছিলেন।১১৭

রাসূল ﷺ বিদায়ী তাওয়াফ করেন এবং তাওয়াফের পর দুই রাকাত নফল সালাত শেষে, রাসূল ﷺ মুলতাজামে আসেন, যেখানে তিনি তাঁর বরকতময় বুক , হাত ও গাল লাগিয়ে রেখে দু’আ করেন।১১৮

বিদায়ী তাওয়াফ ছিল মক্কা ত্যাগ করার আগে হজযাত্রীদের শেষ আমল। যদিও ঋতুস্রাব হওয়া মহিলাদের এটি আদায় করা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।

রাসূল ﷺ এর স্ত্রীদের মধ্যে একজন, হযরত সাফিয়া বিনতে হুয়াই রা., তাঁর ঋতুস্রাব শুরু হওয়ায় হতাশ বোধ করেন। আয়িশা রা. বর্ণনা করেন: রাসূলﷺ হজ আদায় করার পর বাড়ি ফেরার ইচ্ছা পোষণ করেন। তিনি সাফিয়াকে তাঁর তাঁবুর প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন, কারণ তাঁর ঋতুস্রাব হয়েছিল। রাসূল ﷺ বলেন, ‘আকরা হালকা!’ (কুরাইশ উপভাষায় ব্যবহৃত একটি অভিব্যক্তি, যার অর্থ ‘তুমি আমাদের আটকে রাখবে।’) রাসূলﷺ তারপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: ‘তুমি কি কুরবানীর দিনে (১০ই জিলহজ) তাওয়াফে যিয়ারাহ আদায় করেছ?’ তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ।’ রাসূলﷺ বলেন, ‘তাহলে তুমি আমাদের সাথে যেতে পারো।’১১৯

অতঃপর রাসূলﷺ মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

৬.৩বিদায়ী তাওয়াফ~১ মিনিট

হাজযাত্রীগণ তাওয়াফ করছেন, ১৯২৫ সাল

মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে, রাসূল ﷺ তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী মক্কা থেকে কিছু যমযমের পানি নিয়ে যান। পরবর্তীতে উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রা. যখন হজ বা উমরাহ সম্পন্ন করতেন, তখন তিনি কিছু যমযমের পানি তাঁর সাথে নিয়ে যেতেন এবং বলতেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল ﷺ এটি তাঁর সাথে নিয়ে যেতেন।’১২০

তিনি ছোট পাত্র এবং চামড়ার মশক-এ পানি বহন করতেন এবং অসুস্থদের উপর কিছু ছিটিয়ে দিতেন এবং তাদের পান করাতেন। তিনি তাঁর নাতি হাসান এবং হুসাইন রা. কেও পান করার জন্য দিতেন। অন্যদেরও উপহার দিতেন। যমযমের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে তিনি মক্কা থেকে এটি আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

একবার তিনি হযরত সুহাইল ইবনে আমর রা. কে যমযমের পানি চেয়ে চিঠি লিখেন। তিনি বলেন, ‘আমার চিঠি যদি রাতে তোমার কাছে পৌঁছায়, তবে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করো না এবং যদি দিনের বেলায় পৌঁছায়, তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করো না, আমাকে যমযমের পানি পাঠানোর আগে।’ মক্কা বিজয়ের আগে মদিনায় থাকাকালীন তিনি উটের পিঠে দুটি পাত্র ভর্তি পানি পাঠান।১২১

৬.৪যমযমের পানি৩০ সেকেন্ডের কম

একসময় কাবার কাছে একটি ভবন ছিল, যেখানে যমযমের পানি বিতরণ করা হতো, ১৯৪৭ সাল

📚তথ্যসূত্রএই অধ্যায়ের সূত্রসমূহ (১১২টি)
  • ১. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৪
  • ২. আহমাদ
  • ৩. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮; তিরমিযী, হাদীস নং ৮৭৯; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০০৪
  • ৪. আল-বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা
  • ৫-৬ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৭ বুখারী, হাদীস নং ৯৭০; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮১৬
  • ৮. বুখারী, হাদীস নং ১৬৬৫ ও ৪৫২০; মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮ ও ১২১৯
  • ৯. বুখারী, হাদীস নং ১৬৬৪; মুসলিম, হাদীস নং ১২২০; নাসাঈ, হাদীস নং ৩০১৩
  • ১০-১১. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ১২. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯১৭
  • ১৩. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ১৪. দারেমী, হাদীস নং ২২৭
  • ১৫. বুখারী, হাদীস নং ১০
  • ১৬. ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০৫৭
  • ১৭. তিরমিযী, হাদীস নং ২১৫৯
  • ১৮. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ১৯. ইবনে খুযায়মা, হাদীস নং ২৯২৭
  • ২০. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯০৫
  • ২১. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯০৫
  • ২২. নাসাঈ, হাদীস নং ৩০১৪; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯১৯
  • ২৩. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ২৪. ইমাম নববী, আল-ইদাহ ফি মানাসিক আল-হজ্জ ওয়াল উমরাহ।
  • ২৫. মালিক, হাদীস নং ৭১০
  • ২৬. নাসাঈ, হাদীস নং ৩০১১
  • ২৭. তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৮৫
  • ২৮. মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, ১৩৫৭৪
  • ২৯. ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০১৩
  • ৩০. মুসলিম, হাদীস নং ১১২৩
  • ৩১. বুখারী, হাদীস নং ১২৬৬ ও ১৮৫১; মুসলিম, হাদীস নং ১২০৬
  • ৩২. তিরমিযী, হাদীস নং ২৯৭৫; নাসাঈ, হাদীস নং ৩০১৬; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০১৫
  • ৩৩. বুখারী, হাদীস নং ১৩৯৬, ৫৯৮৩; মুসলিম, হাদীস নং ১৩
  • ৩৪. মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদীস নং ৩৪৪০৮
  • ৩৫. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৭৩৪৬
  • ৩৬. বুখারী, হাদীস নং ১৬৮৬
  • ৩৭. বুখারী, হাদীস নং ১৬৭১; মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮ ও ১২৮২; নাসাঈ, হাদীস নং ৩০১৮
  • ৩৮. বুখারী, হাদীস নং ১৩৯, ১৬৬৭ ও ১৬৭০; মুসলিম, হাদীস নং ১২৮০ ও ১২৮২
  • ৩৯. বুখারী, হাদীস নং ১৬৬৮; আহমাদ, হাদীস নং ৬১৫১
  • ৪০. মালিক, হাদীস নং ১৭৫
  • ৪১. বুখারী, হাদীস নং ১৩৯; মুসলিম, হাদীস নং ১২৮০
  • ৪২. মুসলিম, হাদীস নং ১২৮৮; নাসাঈ, হাদীস নং ৬৫৭
  • ৪৩. বুখারী, হাদীস নং ১৩৯
  • ৪৪. বুখারী, হাদীস নং ১৬৮১; মুসলিম, হাদীস নং ১২৯০
  • ৪৫.-৪৬. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৪৭. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৩৫
  • ৪৮. ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০১৩
  • ৪৯. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৫০ নাসাঈ, হাদীস নং ৩০৪১; তিরমিযী, হাদীস নং ৮৯১
  • ৫০. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৫১. বুখারী, হাদীস নং ১৬৮৪; তিরমিযী, হাদীস নং ৮৯৬; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০২২
  • ৫২. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৫৩. নাসাঈ, হাদীস নং ২৬৪৩
  • ৫৪. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮; বায়হাকী, সুনান, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১২৬
  • ৫৫. নাসাঈ, হাদীস নং ৩০৫২, ৩০৫৭ ও ৩০৫৮; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০২৯;
  • ৫৬. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৪৫
  • ৫৭, ৬০. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮৩৪ ও ১৯৬৬
  • ৫৮. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৯৯
  • ৫৯. বুখারী, হাদীস নং ১৫৪৪ ও ১৬৮৩; মুসলিম, হাদীস নং ১২৮১ ও ১২৯৮
  • ৬১. তিরমিযী, হাদীস নং ৯০৩; আহমাদ, হাদীস নং ১৫৪১০
  • ৬২. বুখারী, হাদীস নং ১২১, ১৭৪১, ৪৪০৩, ৪৪০৫, ৪৪০৬, ৫৫৫০ ও ৬৮৬৯; মুসলিম, হাদীস নং ৬৫, ১৬৭৯ ও ১৮৩৮; তাবারানী, হাদীস নং-৭৫৩৫, তিরমিযী, হাদীস নং- ৬১৬
  • ৬৩. তিরমিযী, হাদীস নং ৬১৬
  • ৬৪. বুখারী, আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং ২৯১; আবু দাউদ, হাদীস নং ২০১৫ ও ৩৮৫৫
  • ৬৫. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৫১
  • ৬৬. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০৭৪ ও ৩০৭৬
  • ৬৭. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৩৭; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০৪৮
  • ৬৮. বুখারী, হাদীস নং ১৭১৭ ও ২২৯৯; মুসলিম, হাদীস নং ১৩১৭
  • ৬৯. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ৩১৫৮
  • ৭০. বুখারী, হাদীস নং ১৭০৯ ও ১৭২০; মুসলিম, হাদীস নং ১৩১৯
  • ৭১. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৭২. বুখারী ফিত তারীখ
  • ৭৩. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৪৪১২; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭১৯
  • ৭৪. বুখারী, হাদীস নং ১৭১; মুসলিম, হাদীস নং ১৩০৫; তিরমিযী, হাদীস নং ৯১২
  • ৭৫. শারহ আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়্যাহ
  • ৭৬. বুখারী, হাদীস নং ১৭২৭, ১৭২৮ ও ১৭২৯; মুসলিম, হাদীস নং ১৩০১ ও ১৩০২
  • ৭৭. বুখারী, হাদীস নং ১৭৫৪; মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৯।
  • ৭৮. মুসলিম, হাদীস নং ১২৭৩
  • ৭৯. মুসলিম, হাদীস নং ১২৭৫
  • ৮০. আবু দাউদ, হাদীস নং ২০০১
  • ৮১. বুখারী, হাদীস নং ১৬৩৫।
  • ৮৪. ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ৩০৬১
  • ৮৫. মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮
  • ৮৬. মুসলিম, হাদীস নং ১৩০৮; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৯৮
  • ৮৭. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৬৩৯১; ইবন মাজাহ্‌, হাদীস নং ৩০৫২; দারেমী, হাদীস নং ১৯২১; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৬৮০০।
  • ৮৮. তিরমিযী, হাদীস নং ২৯৭৫; নাসাঈ, হাদীস নং ৩০৪৪
  • ৮৯. মুসলিম, হাদীস নং ১১৪২; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ১৭১৯
  • ৯০. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ৯৯২
  • ৯১. আল-ফাকিহী, আখবারে মাক্কাহ, হাদীস নং ২৩১৩, ২৫৯৩, ২৬০১ ও ২৬০৩; তাবারানী, আল-মুজাম আল-কাবীর, হাদীস নং ১২২৮৩
  • ৯২. বুখারী, হাদীস নং ৭৬, ৪৯৩, ১৮৫৭; মুসলিম, হাদীস নং ৫০৪
  • ৯৩. আবু দাউদ, হাদীস নং ৫৭৫ ও ৬১৪; তিরমিযী, হাদীস নং ২১৯
  • ৯৪. আহমাদ, হাদীস নং ১৭৪৭৫ ও ১৭৪৭৬
  • ৯৫. মুসলিম, হাদীস নং ১২৯৯
  • ৯৬,৯৭,৯৯ বুখারী, হাদীস নং ১৭৫১ ও ১৭৫২
  • ৯৮. মুসনাদে আহমাদ
  • ১০০. তিরমিযী, হাদীস নং ৯০০
  • ১০১. বুখারী, হাদীস নং ১৬৩৪ ও ১৭৪৫; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৫৯
  • ১০২. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৭৫; তিরমিযী, হাদীস নং ৯৫৫; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০৩৭
  • ১০৩. মুসলিম, হাদীস নং ১২৯৮; মিশকাত, হাদীস নং-৩৬৬২, আহমাদ, হাদীস নং-২২২১৫
  • ১০৪. আহমাদ, হাদীস নং- ২৩৫৩৬
  • ১০৫. আবু ইয়া’লা হাদীস নং-৫৫৮৬, বুখারী, ফাতহুল বারী, হাদীস নং-৩৩৩৮
  • ১০৬. মিশকাত হাদীস নং-১৮৬
  • ১০৭. আল-সুনান আল-কুবরা, হাদীস নং ৯৬৭২
  • ১০৮. মুসলিম, হাদীস নং ৩০২৪
  • ১০৯. আবু দাউদ, হাদীস নং ২৯০০
  • ১১০. বুখারী, হাদীস নং ১৫৮৯
  • ১১১. বুখারী, হাদীস নং ১৭৫৬; আবু দাউদ, হাদীস নং ২০১৩।
  • ১১২. মুসলিম, হাদীস নং ১৩১০; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ৩০৬৯; তিরমিযী, হাদীস নং ৯২১
  • ১১৩. বুখারী, হাদীস নং ১১৬
  • ১১৪,১১৬. বুখারী, হাদীস নং ১৫৫৬, ১৫৬১, ১৬৩৮, ১৭৮৫, ১৭৮৭ ও ১৭৮৮
  • ১১৫. আহমাদ, হাদীস নং ১৭১০, ১৪৯৪২, ২৪১৫৯
  • ১১৭. বুখারী, হাদীস নং ৪৬৪, ১৬১৯ ও ১৬৩৩; নাসাঈ, হাদীস নং ২৯২৫
  • ১১৮. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮৯৯; ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ২৯৬২
  • ১১৯. বুখারী, হাদীস নং ৩২৮, ১৫৬১, ১৭৫৭, ১৭৬২, ১৭৭১, ৪৪০১, ৫৩২৯ ও ৬১৫৭; মুসলিম, হাদীস নং ১২১১
  • ১২০. তিরমিযী, হাদীস নং ৯৬৩
  • ১২১. আল-ফাকিহী, আখবারে মক্কা
অধ্যায়-৪

মক্কা থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তন

۞
📑আলোচ্য বিষয়সমূহমক্কা থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তন
  1. ১. মক্কা ত্যাগ
  2. ২. গাদিরে খুম
  3. ৩. রাওহা উপত্যকা
  4. ৪. যুলহুলাইফা
  5. ৫. মদিনায় প্রবেশ
  6. হজ সম্পন্ন করার পর নবীﷺ ১৪ই জিলহজ বুধবার সকালে মদিনার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিলেন। তিনি ৪ই জিলহজ রবিবার মক্কায় প্রবেশ করে মোট ১০ দিন মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় অবস্থান করেন।
  7. এই পর্বে আমরা মক্কা থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তনের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরবো।

রাসূল ﷺ মক্কা থেকে প্রস্থানকালে শহরের নিম্নস্থান (যা আজ শুবাইকা নামে পরিচিত) দিয়ে বের হতেন। যাত্রাপথে তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা বর্ণনা করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন: আল্লাহর রাসূলﷺ যখনই হজ, উমরা বা কোনো সামরিক অভিযান থেকে ফিরতেন, তখন তিনি প্রত্যেক উঁচু স্থানে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং এরপর বলতেন:

প্রসারণ: মোট পড়ার সময়: ~৭ মিনিট
১. মক্কা ত্যাগ~২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড
لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ، وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ، آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ سَاجِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ، صَدَقَ اللَّهُ وَعْدَهُ وَنَصَرَعَبْدَهُ وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ

অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, যিনি এক, যাঁর কোনো অংশীদার নেই। রাজত্ব তাঁর এবং প্রশংসা তাঁর, এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী ও তওবাকারী, ইবাদতকারী, আমাদের রবের উদ্দেশে সিজদাকারী ও প্রশংসাকারী। আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে বিজয় দিয়েছেন এবং সকল শত্রুদের একাই পরাজিত করেছেন।’

যাত্রার পঞ্চম দিনে ১৮ই জিলহজ রবিবার, নবীﷺ মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থান ‘গাদিরে খুম’ নামক জায়গায় যাত্রাবিরতি করেন। যা জুহফার মিকাতের কাছে অবস্থিত। গাদিরে খুম ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যেখানে প্রতিবেশী প্রদেশ থেকে হজ করতে আসা মুসলমানরা নিজ নিজ পথে বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার আগে একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিতেন। এখানে নবী ﷺ একটি গাছের নীচে যোহরের সালাত আদায় করেন, তারপর একটি গুরুত্বপূর্ণ খুতবা দেন, যেখানে তিনি তাঁর চাচাতো ভাই এবং জামাতা আলী রা. এর গুণাবলী ও যোগ্যতার প্রশংসা করেন।

এর আগে হযরত আলী রা. এর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ইয়েমেনে তাঁর সঙ্গে থাকা কিছু লোক প্রশ্ন তুলেছিল। বুরাইদা রা. বর্ণনা করেন: আমি আলীর সঙ্গে ইয়েমেন অভিযানে যাই এবং তাঁর আচরণে শীতলতা লক্ষ্য করি। যখন আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে ফিরে আসি এবং হযরত আলীর কথা উল্লেখ করে তাঁর সমালোচনা করি, তখন আমি নবীজীর চেহারা পরিবর্তন হতে দেখি। তিনি বলেন: ‘হে বুরাইদা, মুমিনদের কাছে আমি কি তাদের নিজেদের চেয়েও ঘনিষ্ঠ নই?’ আমি বলি: ‘হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল।’ তারপর তিনি বলেন: ‘আমি যার মাওলা (অভিভাবক), এই আলীও তার মাওলা।

হযরত যায়দ ইবনে আরকাম রা., যিনি হুসায়ন ইবনু সাবরাহ এবং উমার ইবনু মুসলিম, ইয়াযীদ ইবনু হাইয়্যান রহ. এর নিকট বর্ণনা করেন, একদিন আল্লাহর রাসূল ﷺ মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী ‘খুম’ নামক স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে বক্তৃতা দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও সান শেষে ওয়ায-নাসীহাত করলেন। অতঃপর বললেন, হুঁশিয়ার, হে লোক সকল! আমি একজন মানুষ, অতি সত্বরই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতা আসবে, আর আমিও তার ডাকে সাড়া দিব। তবে আমি তোমাদের মধ্যে দুটি ভারী জিনিস রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব। এতে হিদায়াত এবং আলোকবর্তিকা আছে। অতএব তোমরা আল্লাহর কিতাবকে অনুসরণ করো, একে শক্ত করে আঁকড়ে রাখো। তারপর তিনি কুরআনের প্রতি উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। এরপর বলেন, দ্বিতীয়টি হলো আমার আহলে বায়ত। আমি আহলে বায়তের বিষয়ে তোমাদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি।

২. গাদিরে খুম~২ মিনিট

আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বায়তের বিষয়ে তোমাদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি। হুসায়ন রা. বললেন, রাসূলুল্লাহﷺ এর আহলে বায়ত কারা, হে যায়দ? রাসূলুল্লাহﷺ এর বিবিগণ কি আহলে বায়তের অধিভুক্ত নন? যায়দ রা. বললেন, বিবিগণও আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু আহলে বায়ত তারাই তার (মৃত্যুর) পর যাদের উপর যাকাত নেয়া নিষিদ্ধ। হুসায়ন রা. বললেন, এসব লোক কারা? যায়দ রা. বললেন, এরা আলী, আকীল, জাফার ও আব্বাস রা. এর পরিবার-পরিজনেরা। হুসায়ন রা. বললেন, এদের সবার জন্য যাকাত গ্রহণ নাজায়িয? যায়দ রা. বললেন, হ্যাঁ।

হযরত বারা ইবনে আযিব রা. বর্ণনা করেন: আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ এর সঙ্গে ছিলাম, যখন আমরা গাদির খুমে অবতরণ করি। জামাতে নামাজের ব্যবস্থা করা হয়। আল্লাহর রাসূলের জন্য দুটি গাছের নিচের একটি জায়গা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। তিনি দ্বিপ্রহরের সালাত আদায় করেন এবং আলীর হাত ধরে বলেন: ‘তোমরা কি জানো না, প্রতিটি মুমিনের ওপর মুমিনের নিজের চেয়েও আমার শ্রেষ্ঠ কর্তৃত্ব রয়েছে?’ তারা উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, আপনার আছে। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করেন: ‘তোমরা কি জানো না, প্রতিটি মুমিনের ওপর মুমিনের নিজের চেয়েও আমার বেশি অধিকার রয়েছে?’ তারা উত্তর দেয়, ‘অবশ্যই, আপনার আছে,’। তারপর তিনি আলীর হাত ধরে বলেন: ‘আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যারা তাকে ভালোবাসে, তাদের ভালোবাসো এবং যারা তার প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো।’

গাদিরে খুম পাহাড়

রাওহা উপত্যকায় পৌঁছানোর পর একজন মহিলা তাঁর সন্তান সম্পর্কে একটি প্রশ্ন নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ ’আর-রাওহা’ নামক স্থানে এক কাফেলার সাথে সাক্ষাত হলে তাদেরকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোন কাফেলা? তারা বলল, আমরা মুসলিম। তারা জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কারা? লোকেরা বললো, আল্লাহর রাসূল ﷺ। এ কথা শুনে এক মহিলা অস্থির হয়ে উঠলো এবং ’হাওদা’ থেকে একটি শিশুর বাহু ধরে বের করে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! এ শিশুর হজ আছে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তবে সওয়াব তুমি পাবে।

৩. রাওহা উপত্যকা~৩০ সেকেন্ড

রাসূল ﷺ হজ বা উমরা থেকে ফিরে আসার সময় যুলহুলায়ফায় রাত কাটাতেন এবং পরের দিন মদিনায় প্রবেশ করা। তিনি মক্কায় যাওয়ার সময় এক পথ ও মক্কা থেকে ফেরার সময় ভিন্ন পথ ব্যবহার করতেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার রা. হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ (হজের সফরে) শাজারা নামক পথ দিয়ে গমন করতেন এবং মু‘আররাস নামক পথ দিয়ে (মদিনায়) প্রবেশ করতেন। আল্লাহর রাসূলﷺ যখন মক্কার দিকে সফর করতেন, তখন মসজিদুশ-শাজারায় সালাত আদায় করতেন। ফিরার পথে যুল-হুলাইফাহ’র বাতনুল-ওয়াদীতে সালাত আদায় করতেন এবং সেখানে সকাল পর্যন্ত রাত যাপন করতেন।

৪. যুলহুলাইফা~১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

যুলহুলাইফা মসজিদের পুরাতন একটি ছবি

মদিনায় পৌঁছানোর আগ্রহে নবী ﷺ তাঁর বাহনের গতি বাড়িয়ে দিতেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বর্ণনা করেন: যখন নবী ﷺ কোনো ভ্রমণ থেকে ফিরে মদিনার দেয়াল দেখতেন, তখন মদিনার প্রতি ভালোবাসার জন্য তাঁর উটের গতি বাড়িয়ে দিতেন এবং অন্য কোন পশু হলে তাও তাড়াতাড়ি চালাতেন।

অনেক লোক নবী ﷺ এর সাথে দেখা করতে আসেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন উম্মে সিনান আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহা, যিনি হজে অংশ নিতে পারেননি। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন: নবী ﷺ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: হজ আদায় করাতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তিনি বললেন, অমুকের আব্বা অর্থাৎ তাঁর স্বামী, কারণ পানি টানার জন্য আমাদের মাত্র দু’টি উট আছে। একটিতে সাওয়ার হয়ে তিনি হজ আদায় করতে গিয়েছেন। আর অন্যটি আমাদের জমিতে সেচের কাজ করছে। নবী ﷺ বললেন, রমাযান মাসে একটি ‘উমরাহ আদায় করা একটি ফরজ হজ আদায় করার সমান অথবা বলেছেন, আমার সাথে একটি হজ আদায় করার সমান।

নবী ﷺ তাঁর সাহাবীদের প্রশংসা করে একটি খুতবা দেন। সাহল ইবনে মালিক রা. বর্ণনা করেন: আল্লাহর রাসূল ﷺ যখন বিদায় হজ থেকে মদিনায় আসেন, তখন তিনি মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং বলেন: ‘হে লোকেরা, আবু বকর আমাকে কখনো কষ্ট দেননি, এজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। হে লোকেরা, আমি হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, তালহা, যুবায়ের, আবদুর রহমান ইবনে আউফ এবং মুহাজিরদের প্রতি সন্তুষ্ট। এজন্য তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। হে লোকেরা, আমার সাহাবী, আত্মীয় ও বন্ধুদের সম্মান রক্ষা করো। আল্লাহ চান না তোমরা তাদের কাউকে কষ্ট দাও। হে লোকেরা, মুসলমানদের সম্পর্কে ভালো কথা বলো এবং তাদের কেউ মারা গেলে তার সম্পর্কে ভালো কথা বলো।’১০

৫. মদিনায় প্রবেশ৩০ সেকেন্ডের কম
মদিনা, ১৯২৫ সাল
📚তথ্যসূত্রএই অধ্যায়ের সূত্রসমূহ (১০টি)
  • ১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৫৭, ১২৫৮ ও ১২৫৯
  • ২ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৯৭
  • ৩ মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২২৯৯৫
  • ৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪০৮
  • ৫ মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১৮০১১
  • ৬ সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭৩৬; সুনান আন-নাসাঈ, হাদীস নং ২৬৪৮
  • ৭ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৩৩ ও ১৭৯৯
  • ৮ সুনান তিরমিজি, হাদীস নং ৩৪৪১
  • ৯ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৫৬
  • ১০ তাবারানী, হাদীস নং ৫৬৪০

মানচিত্র, সূত্র ও যোগাযোগ

মক্কা ও মদিনার যিয়ারাহর স্থানসমূহের গুগুল ম্যাপস লিংক

মদিনার যিয়ারাহ স্থানসমূহের গুগুল ম্যাপস লিংক

https://maps.app.goo.gl/ropUtRBawSJ9jLGS8?g_st=ac

মক্কার যিয়ারাহ স্থানসমূহের গুগুল ম্যাপস লিংক

https://maps.app.goo.gl/61AfLLepGwMUFbKi6?g_st=ac

হজ, উমরা ও যিয়ারত: মুফতি নুমান আবুল বাশার, আলী হাসান তৈয়ব

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে হজ করেছেন (জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যেমন বর্ণনা করেছেন): শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহ.)

সীরাতুর রাসূল (ছা) : মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

বাংলা হাদিস বিডির ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপস

মুসলিম বাংলার মোবাইল অ্যাপস

হজ উমরা প্ল্যানার ওয়েবসাইট

হজ উমরা ও মক্কা মদিনার অ্যালবাম: মুফতি নাজমুল হক

ব্যবহৃত বই , অ্যাপস ও ওয়েবসাইট

আলকাউসারের ওয়েবসাইট

https://www.facebook.com/Rihla360/

https://www.facebook.com/share/g/1F7DDpACcF/

আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার:

আমাদের ফেসবুক পেইজ লিংক:আমাদের ফেসবুক গ্রুপ লিংক:০১৭৩৬-৪৩৫ ৬০৪আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে
۞
🤝 আমাদের কমিউনিটিতে যোগ দিন

আল্লাহর মেহমানদের সাথে সংযুক্ত হোন

আপনি কি প্রিয় নবীজী ﷺ–এর হজের আলোকে হজ করতে চান? আপনি যে কাফেলার সঙ্গেই হজে যান না কেন, আমরা আছি আপনার পাশে। যুক্ত হোন আমাদের সাথে — সুন্নাহ অনুসারে হজের প্রস্তুতিতে।

বি. দ্র. আমাদের কোনো হজ এজেন্সি নেই।

📖
আপনি যেখানে পড়া বন্ধ করেছিলেন